নারী চা শ্রমিকদের ভাগ্য পাল্টেনি

0
472

মোঃ মামুন চৌধুরী,হবিগঞ্জ : দুইটি পাতা একটি কুঁড়ি দেশ সিলেট। এ বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে ৩০ টিরমত চা-বাগান। সরকারী হিসেবে এ জেলায় প্রতি বছর এককোটি কেজি চা-পাতা উৎপাদন হয়। এসব উৎপাদিত পাতা দেশের চাহিদা পূরণের সাথে বিদেশে বিক্রি বাবদ দেশ বৈদেশিক মুদ্রা আর্জন করছে।
এসব অর্জনের পেছনে কারা শ্রম দিচ্ছেন, এমন প্রশ্ন উঠলে নারী চা-শ্রমিকদের নাম সবার আগে আসবে। তবে অবদান পুরুষ শ্রমিকদেরও রয়েছে। যদিও ব্যবস্থাপনায় থাকছেন বাগান কর্তৃপক্ষ। গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করতে নারী চা-শ্রমিকের প্রয়োজন। নারী শ্রমিকরাই রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে চা-পাতা সংগ্রহ করে ফ্যাক্টরীতে নিয়ে আসেন। এরপর মেশিনে প্রক্রিয়াজাত হলে চট্রগ্রাম ওয়্যার হাউজে বিক্রির জন্য প্রেরণ করা হয়ে থাকে। চা-বিক্রি করে দেশ, বাগান মালিক, ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু যারা শ্রম দিয়ে গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করেন, তাদের যে হাটু একই কপাল রয়ে যাচ্ছে। তারা সারা দিন কাজ করে চা-গাছ থেকে কমপক্ষে ২১ কেজি পাতা সংগ্রহের বিনিময়ে মাত্র ৬৯ টাকা পরিশ্রম মুল্য পাচ্ছেন। কম হলে বেতন কাটা হবে। তাই ছুঁড়ে দেয়া ২১ কেজি পাতার লক্ষ্যমাত্রা তাদের পূরণ করতে হয়। তবে ২১ কেজির বেশী হলে অতিরিক্তি টাকা দেয়া হয়। এ টাকায় তাদের পরিবার চলতে হচ্ছে। অবশ্য বাগানে তাদের বসবাসে কর্তৃপক্ষকে কোনো বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে না। তার সাথে রেশন হিসেবে কাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিক প্রতি মাসে ১৪ কেজি আটা অথবা চাউল পান এবং মেডিকেল সুবিধার সাথে জ্বালানী কাঠ পাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো এসবে কি একটা পরিবার চলে? তারপরও আটা রুটি আর লাল চায়ের উপর ভর করে শ্রমিকরা  দিন পরিচালনা করছে। তাদের প্রশ্ন এভাবে আর কতদিন জীবন পরিচালনা করা। যদিও বাগান ছাড়া জেলার বিভিন্নস্থানে কাজ করলে একজন শ্রমিক কমপক্ষে দৈনিক ৩’শ টাকা রোজগার করতে পারেন। তারপরও এটাকায় একজন শ্রমিকের পরিবার নিয়ে অতি কষ্টে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। তারমধ্যে কি করে একজন বাগান শ্রমিকের দৈনিক ৬৯ টাকায় চলে?
জেলার রশিদপুর, রামপুর, বৃন্দাবন, ইমাম বাওয়ানী, কামাইছড়া, মধুপুর, ফয়জাবাদ, চিতলাছড়া, তেলিয়াপাড়া, জগদীশপুর, শ্রীবাড়ি, পারকুল, নাসিমাবাদ, বৈকুন্ঠপুর,সুরমা, চাঁনপুর, চন্ডিছড়া, রামগঙ্গা, লস্করপুর, দেউন্দি, লালচান্দ, রেমা, আমু, নালুয়া, আমতলীসহ প্রায় ৩০টি বাগানে প্রায় ৬০ হাজার নারী চা-শ্রমিক এটাকায় জীবিকার চাবিকাটি পরিচালনা করতে গিয়ে দূর্বিসহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
রানী চাষা, ফুলমতি বাউড়ি, কাঞ্চনী চাষা,সুপ্রিয়া চাষারা বলেন- আর কতদিন এভাবে আমাদের কাটবে। আশার বাণী শুনতে আর ভাল লাগে না। তারপরও বাগান আমাদের প্রাণ। তাই প্রাণের মায়ার তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ৬৯ টাকা দৈনিক পারিশ্রমিকে কাজ করে যাচ্ছি। আটা রুটি আর লাল কত খাব। আমাদেরও পোলাও কুরমা খেতে স্বাদ জাগে। স্বাদ হলেও স্বাধ্য নেই। এভাবে চলতে দেয়া যায না। আমাদের বেতনভাতা বৃদ্ধি করতে হবে। তারা বলেন- দাবী জানালেই কর্তৃপক্ষ বলেন- বেতন বাড়বে। এরপর আর বেতন বাড়াতে মনে থাকে না তাদের।
বাগান ম্যানেজার ইসকান্দর হাসান চৌধুরী, রিয়াজ উদ্দিন বলেন- চা-শ্রমিকরা বাগানের প্রাণ। তাদের সুখে দুঃখে বাগান কর্তৃপক্ষ সব সময় সজাগ।  নারী শ্রমিকরা পরিশ্রম করতে পারে। সে অনুপাতে তাদেরকে মূল্যায়ণ করা হয়ে থাকে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রা সুগম করতে বাগান কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমিকদের মাঝে নিয়মিত বেতন, রেশন, জ্বালানী কাঠ, চিকিৎসা, উৎসব ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়াও নানাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে।
একটি সূত্র জানায়, বাগানে পুরুষদের চেয়ে নারীরা তুলনামুলক বেশী পরিশ্রম করেও পারিশ্রমিক বেশী ভোগ করতে পারছেন না। যেকেউ বাগান পরিদর্শনে গেলে কর্মস্থলে বেশীর ভাগই নারীদের পাওয়া যাবে। তারা কাজে ফাঁকি দেয়া পছন্দ করে না। তারপরও সমান বেতন । এতে করে এসব নারী শ্রমিকদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রধান উপদেষ্টা কাঞ্চন পাত্র জানান, ৭টি ভ্যালীর মাধ্যমে দেশের প্রায় ৩৫৮টি বাগান রয়েছে। এরমধ্যে ১৫৮ টি বাগানে ফ্যাক্টরী রয়েছে। আর শ্রমিক রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। তিনি বলেন- হবিগঞ্জের বাগানগুলোতে শ্রমিক লক্ষাধিক। এর মধ্যে বেশীর ভাগ নারী শ্রমিক চা-পাতা উত্তোলনে জড়িত। কিন্তু তাদের ভাগ্য বদলাচ্ছে না।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here