দেশে জলবায়ূ রক্ষায় রেমা-কালেঙ্গার বনাঞ্চল ভূমিকা পালন করছে

0
100

মোঃ মামুন চৌধুরী, রেমা-কালেঙ্গা (হবিগঞ্জ) থেকে ফিরে : রেমা-কালেঙ্গার বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য মূলত তরফ পাহাড় সংরক্ষিত বনভূমির একটি অংশ। যা দেশের অবশিষ্ট প্রাকৃতিক পার্বত্য বনভূমির মধ্যে সর্ববৃহৎ। অভয়ারণ্যটি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার অর্ন্তগত গাজীপুর ও রানীগাও ইউনিয়নে অবস্থিত। এ বনাঞ্চলটি ঢাকা থেকে আনুমানিক ১৪০ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে এবং সিলেট থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অবস্থিত। বনাঞ্চলটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত রয়েছে। অপেক্ষাকৃত দুর্গম স্থানে অবস্থিত বলে এই সমৃদ্ধ মিশ্র চিরহরিৎ বনটি এখনো টিকে থাকায় দেশের সুস্থ জলবায়ূ রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করছে। অভয়ারণ্যটির আশেপাশে রয়েছে ৩টি চা-বাগান। যার ফলে চা-বাগান ও এ বনাঞ্চল উভয়টিই দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে।
এ অভয়ারণ্যটিকে ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ(সংশোধণ) আইন অনুসারে প্রথমত ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে একে সম্প্রসারণ করা হয়। রেমা কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও পশুপাখির আবাসস্থল এবং বিশেষ করে পাখি দর্শনের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ট স্থান। পূর্ববতী জরিপে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ ছিল। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রিপুরা, সাওতাল ও উড়ং এই বনভূমির আশেপাশে এবং অভ্যন্তরে বসবাস করে আসছে।
এদিকে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি বর্ধিতকরণের মাধ্যমে জলবায়ূ পরিবর্তন প্রতিরোধকল্পে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এর প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ প্রকল্প অবহিতকরণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।  রেমা-কালেঙ্গা নিসর্গ সংস্থা, সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি, রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এর বাস্তবায়নে ও ক্লাইমেন্ট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস্ এন্ড লাইভলিহুডস্  (ক্রেল) প্রকল্পের সহযোগীতায় ৯ মে দিনব্যাপী এ কর্মশালায় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সভাপতি পিপি এম আকবর হুসেইন জিতুসহ নানাস্তরের নেতৃবৃন্দরা অংশগ্রহণ করে এ বনটি রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন।
পরিদর্শনকালে জানা গেছে, এ বনটি দেশের দ্বিতীয় বন। তাই বনটি রক্ষা পেলে দেশের জলবায়ূ রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ পালন করবে। জলবায়ূ রক্ষার স্বার্থে এ বনাঞ্চলের উন্নয়নে বনবিভাগ, সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি, ক্রেলসহ সংশ্লিষ্টরা নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
অপরদিকে জানা গেছে, নাম কারার মাহবুব হোসেন। তিনি সিলেট বনবিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল কালেঙ্গার বিট কর্মকর্তা। পদবী ফরেষ্টার। এখানে যোগদান করেছেন ২০১৪ সালের ২২ জুলাই। এর পর থেকে তিনি বনরক্ষায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলহাজ্ব মোঃ দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে জেলার সহকারী বন সংরক্ষক এজেট হাসান মাহমুদ ও রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদিরের দিক নির্দেশনায় তিনি বনাঞ্চল রক্ষায় বনকর্মীদের নিয়ে কাজ করছেন। এর ফলে এ পর্যন্ত চিহ্নিত বনদস্যু হাফিজ, আব্দুল কবির, সেলিম, কাজল, বজলু, আফজালসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। তারা অনেকই বন মামলায় জেলে রয়েছেন। এদিকে লেবু বাগানের নাম করে বনের জমি ভূমিদস্যুদের কবলে চলে যায়।  এরমধ্য থেকে প্রায় ৪০ একর বনের জমি উদ্ধার হয়। বনদস্যু গ্রেফতার ও  জমি উদ্ধার করে তিনি বসে থাকেননি। এ বনটি রক্ষায় দিনরাত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছেন। যার কারণে বর্তমানে বনদস্যুরা এ বনটিতে প্রবেশ করতে পারছে না। এতে তৈরী হচ্ছে গভীর অরণ্য। তার সাথে বন্যপ্রাণিদের আবাসস্থল আরো নিরাপদ হচ্ছে। তার সাথে দিন দিন পর্যটকদের পদচারণ বেড়েই চলেছে।
পরিবেশপ্রেমিকরা মনে করেন, এ বিট কর্মকর্তাসহ সংশ্লিদের পদক্ষেপে কালেঙ্গার বনাঞ্চল নতুন সাজে রুপ নিয়ে আরো গভীর অরণ্যে পরিনত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বনগবেষক আহমদ আলী বলেছেন- কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা বন রক্ষায় একজন দক্ষ ব্যক্তি। তিনি পরিশ্রমী। তাকে সবার সহযোগীতা করা উচিৎ। তিনি বলেন- সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলহাজ্ব মোঃ দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে জেলার সহকারী বন সংরক্ষক এজেট হাসান মাহমুদ ও রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদিরের দিক নির্দেশনায় বনাঞ্চল রক্ষায় বনকর্মীরা কাজ করায় রেমা-কালেঙ্গা এখনও গভীর অরণ্য।
ক্রেল এর সাইড কর্মকর্তা অর্জুন চন্দ্র দাশ বলেন- এ বনটি রক্ষা করতে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ক্রেল আর্থিক অনুদান ছাড়াও বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। আর এ কমিটি বন পাহারা দেয়ার জন্য সমাজের নানাস্তরের ১৩৭ ব্যক্তিদের নিয়ে বন টহল দল গঠন করেছে। এদের ৯ মে’র সভায় এদের ৬৮ জনের মধ্যে টহল ভাতা হিসেবে ৪৮ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এভাবে টহল দলের সবাইকে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে ক্রেলের আর্থিক সহায়তায়।
সূত্র প্রকাশ, জেলার চুনারুঘাট, মাধবপুর, নবীগঞ্জ, বাহুবল উপজেলার মধ্যে ৩৬২৪৯.৭ একর জমির মধ্যে রয়েছে বনভূমি। এর মধ্যে হবিগঞ্জের সহকারী বন-সংরক্ষক ২৭৩৩৬.৬৯ একর বনভূমির তদারকি করছেন। জেলার বনভূমিকে ৪টি রেঞ্জে ভাগ করা হয়েছিল। বর্তমানে ৩টি রেঞ্জ রয়েছে। ১টি রেঞ্জ ওয়াল্ডলাইফ নিয়ে গেছে। আর ৩টি রেঞ্জ ও বিট অফিসগুলো  দেখভাল করার জন্য রয়েছেন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। বনাঞ্চল রক্ষা করতে বিলম্ব না করে জরুরী ভিত্তিতে আরো বেশি পরিমানে লোকবল বাড়ানো প্রয়োজন।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেঞ্জ- এর অধীনে প্রায় ২৪’শ একর জমিতে রয়েছে পুটিজুড়ি বনবিট, কালেঙ্গায় রেঞ্জ- এর অধিনে ১৪ হাজার ২’শ ৮১ একর জমিতে কালেঙ্গা, রশিদপুর, ছনবাড়ী, রেমা বনবিট ও রঘুনন্দন রেঞ্জ-৩ এর অধীনে ১০ হাজার ৭’শ ৯৮ একর জমিতে শালটিলা, শাহপুর, জগদীশপুর, শাহজীবাজার বনবিট রয়েছে। যদিও ইতিপূর্বে সাতছড়ি রেঞ্জটি ওয়ার্ল্ডলাইফ উদ্যান করার জন্য হবিগঞ্জ বন বিভাগ থেকে আলাদা করে নিয়ে যায়।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here