ক্রিকেটের মহাশক্তি বাংলাদেশ

0
111

ক্রীড়া প্রতিবেদক :বাংলাদেশ এখন ইতিহাস। বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটের মহাশক্তি। বাংলাদেশ এখন আর দাবিয়ে রাখার পর্যায়ে নেই। বিশ্বের যে কোনো দলকেই টাইগারদের সঙ্গে লড়তে দুবার ভাবতে হবে। মিরপুরের লড়াইয়ে টাইগারদের হাতে বাংলাওয়াশ হওয়ার শঙ্কায় ভুগছে দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাওয়াশ থেকে রেহাই পাওয়ার লড়াই চলছে তাদের। বেঁচে গেলেও পরাজয় নিয়েই দেশে ফিরতে হবে তাদের। কারণ, সিরিজ আগেই জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ।
নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান বাংলাওয়াশের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে এবার। স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে ছিটকে ফেলার কথাও।
২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যায় তারুণ্যোদ্দীপ্ত বাংলাদেশ। দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে স্বাগতিকদের ধবলধোলাইয়ের পর তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজেও তাদের নাকানি চুবানি দেয় টাইগার বাহিনী।
প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ৫২ রানে, দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে ৩ উইকেটে এবং তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচেও ৩ উইকেটে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে প্রথম কোনো জায়ান্টকে ‘বাংলাওয়াশ’ করার নজির গড়ে টাইগার বাহিনী।
২০১০ সালের অক্টোবরে পূর্ণাঙ্গ শক্তি নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসে নিউজিল্যান্ড। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে ঘরের মাঠে নাস্তানাবুদ করে আসা কিউইরা টাইগারদের হাতে বেদম নাকানি-চুবানি খায়।
প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ৯ রানে, দ্বিতীয় ম্যাচ পরিত্যক্ত, তৃতীয় ম্যাচে ৭ উইকেটে, চতুর্থ ম্যাচে আবারও ৯ রানে এবং পঞ্চম ম্যাচে ৩ রানে হারিয়ে সফরকারীদের ধবলধোলাই করে ফেরত পাঠায় টাইগার বাহিনী।
২০১৩ সালে আবারও বাংলাওয়াশ হয় নিউজিল্যান্ড। প্রায় তিন বছর পর আবারও বাংলাদেশ সফরে আসে কিউই বাহিনী। এবারও ওয়ানডে  সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে ধবলধোলাই দিয়ে ফেরত পাঠায় স্বাগতিকরা। প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ৪৩ রানে, দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে ৪০ রানে এবং তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচে ৪ উইকেটে কিউইদের হারিয়ে তাদের দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাওয়াশ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
সবশেষ গত বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ সফরে আসে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান। তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে প্রথম খেলায় ৭৯ রানে, দ্বিতীয় খেলায় ৭ উইকেটে এবং তৃতীয় খেলায় ৮ উইকেটে জয় নিয়ে তৃতীয় জায়ান্ট বাংলাওয়াশ নিশ্চিত করে টাইগাররা।
অবশ্য পরাশক্তি দলগুলো বাংলাওয়াশ হতে শুরু করার আগে থেকেই টাইগারদের হাতে নিয়মিতভাবে ধবলধোলাই খেয়ে আসছে জিম্বাবুয়ে, কেনিয়ার মতো একসময়ের শক্তিশালী দলগুলোও।
বাংলাদেশের জায়ান্ট কিলিং কা-ের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়াকে ধরাশায়ী করা, ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় করে দেওয়া এবং সেকেন্ড রাউন্ডে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দেওয়া, ২০১১ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়া এবং সবশেষে সেই ইংল্যান্ডকেই গত বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড থেকে হটিয়ে দেওয়া।
বাংলাদেশের এ ‘বাংলাওয়াশ’ ও জায়ান্ট কিলিং মিশনে আতঙ্কিত হয়ে স্বদেশি দলগুলোকে সতর্ক থেকে খেলার কথা বলে আসছেন প্রতিপক্ষের সাবেক গ্রেটরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন আর বাচ্চা বলার সুযোগ নেই, তারা এখন ঘোষণা দিয়ে নাকানি-চুবানি দিচ্ছে পরাশক্তি দলগুলোকে। বাচ্চারা এখন বড় হয়ে গেছে। এবার ভারতও হাড়ে হাড়ে টের পেল টাইগার কাকে বলে।
বড় হওয়ার এই পর্যায়টা প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের হলেও নিঃসন্দেহেই টাইগার ভক্তদের জন্য মহাউচ্ছ্বাসের খবর। এ উচ্ছ্বাসটা লেগে থাকুক সারাটা বছর পুরো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে।
বাংলাদেশি তরুণ পেসার মুস্তাফিজুর রহমান আজ অনন্য রেকর্ডের অংশীদার । একদিনের আন্তর্জাতিকে তিন ম্যাচ সিরিজে ১৩ উইকেট শিকার করে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের তালিকায় এখন যৌথভাবে শীর্ষে তিনি।
বুধবার (২৪ জুন) ভারতের বিপক্ষে চলতি সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে দুটি উইকেট নিয়ে এ কীর্তি গড়েন মুস্তাফিজ। এদিন তিনি ভারতীয় উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মা ও মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান সুরেশ রায়নার উইকেট শিকার করেন তিনি।
২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলীয় ফাস্ট বোলার রায়ান হ্যারিস এক সিরিজে ১৩ উইকেট শিকার করে রেকর্ড গড়েন। ভারতের বিপক্ষে সাতক্ষীরার বোলিং বিস্ময় মুস্তাফিজ তার দশম ওভারে সুরেশ রায়নাকে সরাসরি বোল্ড করে হ্যারিসের রেকর্ডে ভাগ বসান।
চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচে অভিষিক্ত হয়ে ৫০ রান খরচে ৫ উইকেট নেন মুস্তাফিজ। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে ৪৩ রান খরচে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান তিনি।
মুস্তাফিজের বিধ্বংসী বোলিংয়েই কুপোকাত হয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ হারায় মহেন্দ্র সিং ধোনির ভারত। এই সিরিজ জয়ের মাধ্যমে টানা তিনটি সিরিজ জয় করলো মাশরাফি বিন মর্তুজার টাইগার বাহিনী।
গতকাল বাংলাওয়াশ’ নিশ্চিত করতে ভারতের ছুঁড়ে দেওয়া ৩১৮ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে দলীয় দ্বিতীয় ওভারে কুলকার্নির বলে এলবি’র ফাঁদে পড়েন তামিম ইকবাল। আউট হওয়ার আগে মাত্র ৫ রান করেন তিনি।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় উইকেট হিসেবে ফেরেন ব্যাটে ঝড় তোলা সৌম্য সরকার। দলীয় দশম ওভারে ৩৪ বলে ব্যক্তিগত ৪০ রান করে কুলকার্নির বলে অশ্বিনের তালুবন্দি হন সৌম্য। আউট হওয়ার আগে ভারতের বোলারদের সাতবার মাঠের বাইরে পাঠান। যার মধ্যে দুটি ছক্কার মার ছিল। লিটন দাস, সাকিব, মুশফিক সহ ৫টি উইকেট যাবার পরও তরুণ ব্যাটসম্যানরা দাপটের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। এ রিপোর্ট লেখার সময় বাংলাওয়াশে দরকার মাত্র ১২০ রান।
এর আগে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শিখর ধাওয়ান, মহেন্দ্র সিং ধোনি, আম্বাতি রাইডু আর সুরেশ রায়নার ব্যাটে ভর করে সফরকারীরা নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৬ উইকেট হারিয়ে ৩১৭ রান সংগ্রহ করে।
টাইগারদের বোলিং সূচনা করতে আসেন ক্রিকেট বিশ্বের বোলিং চমক মুস্তাফিজুর রহমান। আর ভারতের ব্যাটিং উদ্বোধনের দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট হাতে নামেন রোহিত শর্মা এবং শিখর ধাওয়ান।
জয় নিয়ে দেশে ফিরতে মরিয়া সফরকারীদের ব্যাটিং লাইনআপে যথারীতি আঘাত হানেন মুস্তাফিজ। মুস্তাফিজের করা দলীয় সপ্তম ওভারের শেষ বলে উইকেটের পেছনে লিটনের হাতে ক্যাচ দেন রোহিত শর্মা। প্রথম দুই ওয়ানডেতেও মুস্তাফিজের বোলিং তোপে রোহিত আউট হয়েছিলেন। আউট হওয়ার আগে রোহিত ২৯ বলে দুই চার আর এক ছয়ে ২৯ রান করেন।
দলীয় ২০তম ওভারে আক্রমণে আসেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। তার অসাধারণ ঘূর্ণিতে আউট হন ভারতের ব্যাটিং স্তম্ভ বিরাট কোহলি। নিজের প্রথম ওভারে এসেই বাজিমাত করেন সাকিব। বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরার আগে কোহলি করেন ৩৫ বলে ২৫ রান।
‘হোয়াইটওয়াশ’ এড়াতে লড়তে থাকা ভারতের ওপেনার শিখর ধাওয়ানকে ফেরান মাশরাফি। দলীয় ২৭তম ওভারে মাশরাফির বলে নাসির হোসেনের তালুবন্দি হন ধাওয়ান। আউট হওয়ার আগে তিনি ৭৫ রান করেন। টাইগারদের অন্যতম ফিল্ডারে পরিণত হওয়া নাসির দারুণ ভাবে ধাওয়ানের ক্যাচটি লুফে নেন। ধোনির সঙ্গে ৪৪ রানের জুটি গড়া ধাওয়ান ৭৩ বলে দশটি চার হাঁকান।
৪১তম ওভারে নিজের বলে নিজেই ক্যাচ নিতে চেয়েছিলেন আরাফাত সানি। ব্যক্তিগত ৩৪ রানের মাথায় সানির হাতে জীবন ফিরে পান রাইডু।
দলীয় ১৫৮ রানে টপঅর্ডারের তিন উইকেট খুঁইয়ে ফেলা সফরকারীরা ‘বাংলাওয়াশ’ এড়াতে দলের সংগ্রহ বাড়িয়ে নিতে থাকে। ৪৪তম ওভারে মাশরাফির শিকারে সাজঘরে ফেরেন ব্যক্তিগত ৪৪ রান করা আম্বাতি রাইডু। ধোনির সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে ৯৩ রানের জুটি গড়েন রাইডু। আউট হওয়ার আগে ৪৯ বল মোকাবেলা করেন তিনি।
এরপর মাশরাফির তৃতীয় শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন ধোনি। দলীয় ৪৬তম ওভারে আক্রমণে এসে টাইগার দলপতি ব্যক্তিগত ৬৯ রান করা টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ককে মুস্তাফিজের তালুবন্দি করেন। আউট হওয়ার আগে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫৯তম অর্ধশতক হাঁকান ধোনি। ৭৭ বল মোকাবেলা করে ছয় চার আর একটি ছক্কা হাঁকান ভারত অধিনায়ক।
শেষ দিকে ব্যাটিংয়ে নেমে সুরেশ রায়না ২১ বলে ৩৮ রানের ইনিংস খেলেন। রায়নাকে বোল্ড করে ফিরিয়ে দেন মুস্তাফিজ।
টাইগারদের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি উইকেট নেন মাশরাফি। দুটি পান মুস্তাফিজ আর একটি উইকেট নেন সাকিব।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here