ইউরোপে হাওরের বিষমুক্ত শুঁটকি

0
207

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ :   প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে ‘শুঁটকি’। প্রিয় এ খাবারটি বিষমুক্তভাবে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে হবিগঞ্জ জেলার হাওর এলাকায়। এ জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ, লাখাই, মাধবপুর, বাহুবল উপজেলার হাওরের পানি শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শুরু করে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা।
তারা কাঁচা মাছ সংগ্রহ করে শুধুমাত্র লবণ ব্যবহার করে রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে। পরে স্থানীয় বাজারের আড়ৎ মালিকদের কাছে বিক্রি করে। আড়ৎ মালিকরা এসব শুঁটকি নিয়মনীতি মেনে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে পাঠান।
হবিগঞ্জের হাওরের শুঁটকিতে বিষ নেই। কারণ, রৌদে শুকানোর সময় উৎপাদনকারীরা লবণ ছাড়া কোন প্রকারের কেমিক্যাল ব্যবহার করেন না। আর এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জেলা মৎস্য বিভাগ।
তবে হবিগঞ্জে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়ে থাকে পুঁটি মাছের শুঁটকির। এ ছাড়াও নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকির উৎপাদনও হচ্ছে। উৎপাদন হচ্ছে সিদলেরও। সিদল তৈরিতে ব্যবহার করতে হয় পুঁটি মাছের টেপার তেল। হাওরের নারীরা টেপার তেল উত্তোলন করে লাখ লাখ টাকা আয় করতে পারছেন।
হবিগঞ্জের হাওর এলাকায় প্রায় ৮/৯ মাস পানি থাকে, বাকি সময় পানি শুকিয়ে যায়। এ সময় প্রচুর পুঁটি মাছ ধরা পড়ে। এ সময়ের বাড়তি মাছে শত শত মণ শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। হবিগঞ্জের পুঁটির শুঁটকি ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে কদর বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন উৎপাদনমুখী হচ্ছেন হাওরের নারী-পুরুষ। তারা এসব শুঁটকি বিক্রি করে নিজেরদেরকে স্বাবলম্বী করে তুলছেন।
এ দিকে শুঁটকির উৎপাদন বাড়াতে জেলা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাতে করে উৎপাদনকারীরা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন।
জেলার বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের ভাটিপাড়া গ্রাম। এ গ্রামটি হাওর এলাকায় অবস্থিত। এখানে প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস। তারা প্রায় ৮ মাস মাছ শিকার আর হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে বিক্রি করে জীবন জীবিকা পরিচালনা করছেন। এরমধ্যে অনেকে আবার নানা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। বছরের বাকী ৪ মাস পুঁটির শুঁটকি ও শুঁটকির টেপা থেকে তেল উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
শুঁটকি উৎপাদন কাজে তারা খোলা মাঠে মাচাং তৈরি করেন। এরপর কাঁচা মাছ ক্রয় করে এসব মাছ প্রক্রিয়াজাত করে মাচাংয়ে রৌদে শুকান। শুকানো শুঁটকি ২২ থেকে ৩০ হাজার টাকায় মণপ্রতি বিক্রি করেন আড়ৎদারদের কাছে।
এ ব্যাপারে আলাপকালে শুঁটকি উৎপাদনে নিয়োজিত ভাটিপাড়ার বাসিন্দা নিভা রাণী দাশ বলেন, আমরা মাচাং তৈরি করে চারপাশে জাল দিয়ে রাখি। পরে ভাল মাছ সংগ্রহ করি। মাছ ভালভাবে ধোয়া হয়। টেপা মাছ থেকে আলাদা করে লবণ ব্যবহার করে রৌদে শুকাতে দেই। পরে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করি ।
সুলতা রাণী, কালীতারা রাণী দাশরা বলেন, ‘মাছ থেকে টেপা আলাদা করা হচ্ছে। এগুলো থেকে তেল সংগ্রহ করা হবে। এসব তেল প্রতিলিটার ১০০ টাকা বিক্রি করে মাসে জনপ্রতি ৪/৫ হাজার টাকা রোজগার করা যায়।  আর এ তেল ব্যবহার করেই তৈরি করা হচ্ছে সিদল।
বৃদ্ধ কৃষ্ণপদ দাশ বলেন, ‘লাভ যাই হোক বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন করে যাচ্ছি। কম মুনাফায়  শুঁটকি উৎপাদনে আমাদের ভাটিপাড়া ছাড়াও জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ, লাখাই, মাধবপুর, বাহুবল উপজেলার হাওরের ভবানীপুর, নতুন নোয়াগাও, কেলি কানাইপুর, রউয়াইলসহ বিভিন্ন এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন কাজে শত শত নারী-পুরুষ জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘এ জেলার হাওরের শুঁটকির চাহিদা ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে। রপ্তানিও হচ্ছে। এ শিল্পকে আরো এগিয়ে নিতে আমরা নানাভাবে কাজ করছি।উৎপাদনকারীদেরকে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে নানাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, জেলার জলাশয়গুলো নিয়মিত না খনন করায় অগভীর হচ্ছে। যার কারণে শুকনো মৌসুম আসা মাত্র অনেকস্থানে পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। তারপরও মাছের উৎপাদন কম হচ্ছে না। যদিও সরকারীভাবে গত বছর জেলায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫টি বিল খনন করা হয়েছে। এভাবে প্রতি বছর খনন কাজ করা হলে হাওরের জলাশয়ে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি হবে। বেড়ে যাবে মাছ আহরণ ও শুঁটকি এবং সিদল উৎপাদন।
তিনি জানান, জেলার নবীগঞ্জ, বাহুবলসহ  হাওরাঞ্চলখ্যাত এলাকায় নারী মৎস্যজীবিদের উন্নয়নে উন্নতভাবে শুঁটকি তৈরিকরণে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। যদি আরো ব্যাপকভাবে এ শুঁটকি স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানী হয় তাহলে অবহেলিত মৎস্যজীবিদের চলার পথ আরো সুগম হবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here