চলেই গেলেন বুভুক্ষু মানুষের কবি

0
679

নিজস্ব প্রতিবেদক : কবি রফিক আজাদ আর নেই। প্রায় দুই মাস ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার মারা গেছেন তিনি।
৭৪ বছর বয়সী রফিক আজাদের ১৪ জানুয়ারি রাতে ‘ব্রেইন স্ট্রোক’ হয়। প্রথমে বারডেম, পরে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এরপর ১৫ জানুয়ারি তাকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে পরাজিত হন কবি। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়েছেন।
বিএসএমএমইউতে উপস্থিত জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত সাংবাদিকদের বলেন, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সোমবার কবির মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সকাল ১০টায় মরদেহ নেওয়া হবে শহীদ মিনারে। সেখান থেকে বাংলা একাডেমিতে নেওয়া হবে কফিন। জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মসজিদে জানাজা হবে। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবিকে সমাহিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কবিপতœী দিলারা হাফিজ সাংবাদিকদের বলেন, “একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হোক, আমরা শুধু এটাই চাই।”
একাত্তরে টাঙ্গাইলে আবদুল কাদের সিদ্দিকী নেতৃত্বাধীন কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এই কবি।
গত জানুয়াতে ব্রেইন স্ট্রোকের পর রফিক আজাদকে বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতাল হয়ে তাকে আনা হয় বিএসএমএমইউতে। এরপর এই হাসপাতালেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিলেন তিনি। শনিবার দুপুরে চিকিৎসকরা এই কবির মৃত্যু ঘোষণা করেন বলে তার বড় ভাইয়ের মেয়ে নীরু শামসুন্নাহার  জানান।
১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম রফিক আজাদের। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর  ডিগ্রি নিয়ে শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা।
এরপর বাংলা একাডেমিতে যোগ দিয়ে একাডেমি প্রকাশিত পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাপ্তাহিক রোববার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন তিনি। কাজ করেছেন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে।
স্কুলজীবনে কবিতার হাতেখড়ি হওয়া রফিক আজাদ কেন লিখছেন, তার উত্তর নিজের কবিতায় দিয়েছেন এভাবে- “নির্বিবেক মধ্যবিত্ত পাঠকের পরম্পরাময়/মাংসল পাছায় খুব কষে লাথি মারা সম্ভব হয় না বলে/ লাথির বিকল্পে লেখাৃ”
রফিক আজাদের জনপ্রিয় অনেক কবিতার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হল ‘ভাত দে হারামজাদা’। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে তার এই কবিতা। এই কবিতার জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার বিরাগভাজন হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবির ‘স্বাধীনতা’য় হস্তক্ষেপ করেননি বলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন রফিক আজাদ। “বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী আর আনওয়ারুল আলম শহীদ, বঙ্গবন্ধুর কাছে আমারে নিয়া গেছিলেন। উনি ব্যাখ্যা চাইলেন। আমি ব্যাখ্যা দিছি, সারা পৃথিবীর নিরন্ন মানুষের প্রধান চাওয়া হলো ভাত। আমি সারা পৃথিবীর লোকের কথা বলছি। আর আমাদের দেশে, নিরন্ন মানুষ এই ভাষাতেই কথা বলে।
“এটা বলার পর উনি বলে, ‘তা বটে!’ আমার কাঁধে হাত রাইখা বলল, ‘ভালো লিখছিস, যাহ’।”
কবিতা লেখার শুরুর অনেক পরে বেরিয়েছে রফিক আজাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে- ‘অসম্ভবের পায়ে (১৯৭৩); সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে (১৯৭৪); নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫); চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া (১৯৭৭)। ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে তাকে একুশে পদক দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের পর সাহিত্য কর্মের জন্য আরও অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।

Share on Facebook