চৈত্র-বৈশাখ :পূরবী বসু

0
269

বয়স কত হলো, বুঝতে পারি কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ করে। চুলের রং, চামড়ার ভাঁজ, মাংসপেশির শৈথিল্য, মেজাজের রুক্ষতা, দুশ্চিন্তার আধিক্য, অবহেলিত ভাবার প্রবণতা-এ রকম অনেক কিছুই প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় বয়স হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মনে করিয়ে দেয় চোখের সামনে যারা হলো, তাদের বেড়ে ওঠা, বিশেষত তাদের সংসারিপনা ও বয়স্কজনোচিত ব্যবহার। ইদানীং আরো একটি ব্যাপার প্রায়ই আমাকে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, আমরা আরেক কালের মানুষ- আরেক পৃথিবীরও বা! আর সেটি হলো দৈনন্দিন জীবনে গ্রামীণ সংস্কৃতির তিরোধান। একসময় যা অতি পরিচিত, অতি স্বাভাবিক ছিল, আজ তা লোকমুখেও শোনা যায় না। এমনকি গ্রাম বা ছোট ছোট শহরেও নয়। চোখের সামনে সব অদৃশ্য হয়ে গেল।
পহেলা বৈশাখ দোরগোড়ায়। আরো একটি বছর শেষ হলো। মনে পড়ে, ছোটবেলায় চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে কী ঘটা করে উৎসব চলত! পুরোনো বছরের সমস্ত আবর্জনা দূর করার জন্য সেদিন গ্রামের ঘরে ঘরে, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতর, বাড়িঘর, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-জামা ধোয়ার ধূম পড়ে যেত। ব্যবহৃত সব মাটির হাঁড়ি-পাতিল ফেলে দেওয়া হতো সেদিন। প্রতিটি ঘর ঝাড়মোছ করে ঝুল ঝেরে বিছানা-চাদর, কাপড়, জামা সব সাবান-সোডা দিয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে হতো। লেপ-তোশক কাঁথাও সূর্য সেঁকা করা হতো। মাটির ঘর হলে ভালো করে মেঝে, রোয়াক ও উঠোন লেপে নিতে হতো। সেদিন বাড়ির মেয়েরা ঘরবাড়ি পরিষ্কারে এতটা ব্যস্ত থাকত যে রান্না হতো খুব সংক্ষিপ্ত। দিনের বেলা বেশিরভাগ বাড়িতে দই, চিড়া, মুড়ি খেয়েই কাটত। রাতে নিরামিষ, বিশেষ করে তেতো ডাল কি শুধু ডাল রান্না হতো। সেদিন স্নানের আগে দু’পায়ের ভেতর দিয়ে পেছন দিকে ছাতু ছিটিয়ে প্রতীকী শত্রু নিধন হতো। অর্থাৎ শত্রুর মুখে ছাই দেওয়া হতো।
চৈত্র মাস মহাদেবের বন্দনার মাস। এ মাস জুড়ে সারা বাংলায় একসময় গাজন নাচ চলত। আমাদের বিক্রমপুরে আমরা বলতাম ‘কালীকাছ’। শব্দটা যথার্থ কি না, আমার এখন সন্দেহ রয়েছে। অর্থও হয় না কিছু। তবু গভীর রাতে শিব ও কালী সেজে নৃত্যরত দল বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে উঠানে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে তাদের প্রদর্শনী চালাত যে নামে, তাকে আমরা ছেলেবেলায় ‘কালীকাছ’ বলেই জানতাম। চৈত্র মাস জুড়ে তারা আসত বাড়ি বাড়ি। গ্রাম থেকে বিভিন্ন দল আসত অন্য গ্রামে ও শহরে। চৈত্র মাসের যেকোনো রাতে তারা আসতে পারে। পূর্বঘোষণা দিয়ে আসত না তারা। হঠাৎ করে এসে গৃহকর্তাকে জাগিয়ে তার অনুমতি নিয়ে ঢোল করতালসহ নৃত্য পরিবেশন করত। মনে আছে, ছোটবেলা ঘুমন্ত আমাদের কখনো তুলে দিত মা, কখনো ঠাকুমা। কখনো আবার নিজ থেকেই ঘুম ভেঙে যেত হারমোনিয়াম আর ঢোলের বাজনায়।
‘কালিকাছ আসছে, কালিকাছ আসছে’ বলে একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে আসতাম আমরা ছেলেমেয়েরা। আমার মনে পড়ে, এক চৈত্র রাতে এমনি করে পরপর তিন তিনটি দল এসে নেচেছিল আমাদের উঠানে। সেদিন রাতে আর কারো ঘুম হয়নি। যখনই ঘুমুতে যাব আরেক দল এসেছে। মহল্লায় সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ডাক্তার হওয়ায় আমার বাবাকে এর খেসারত দিতে হতো। কাউকে অখুশি করে বিদায় দিতে পারতেন না বাবা। ফলে আমাদের বাসায় সকল দলই তাদের কসরৎ দেখাত। পাড়াপ্রতিবেশীরা পুরুষ নারী, শিশু দল বেঁধে উঠানের চারদিকে গোল হয়ে বসতাম আমরা। হ্যাজাকের আলোতে দেখতাম লাল জিব বের করে কালো মুখোশ ও গায়ে কালোর ওপর ঝলমলে পোশাক ও নরমু-ের মালা পরিহিতা কালী দুই তরবারি নিয়ে বাজনার তালে তালে নাচছে।
ত্রিশূলসহ সাদা গায়ের রঙের মহাদেব মোটা গোঁফ ও বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে নাচছে সঙ্গে সঙ্গে। একসময় কালী দাঁড়িয়ে পড়ত ভূপতিত মহাদেবের গায়ের ওপরে।
যে দলই আসুক না কেন, জেলেপাড়ার মহাদেব আমাদের সকলের প্রিয় ছিল। জেলে পাড়ার দলের মহাদেব যারা সাজত তারা ছিল দুই ভাই। দুই ভাই দেখতে অনেকটা একরকম। কে কখন মহাদেব সাজত বোঝা যেত না। দুজনেরই বিরাট বপু ও গোঁফ। দুটোই আসল তাদের। চোখও থাকত সব সময় লাল। শোনা যেত, মহাদেবের মতোই গাঁজা খায় দুই ভাই।
এই মহাদেব যখন উঠানে নাচত হেলেদুলে, মনে হতো ছবিতে দেখা শিব স্বয়ং নেমে এসেছে আমাদের বাসায়। কোনো কোনো দলে আবার জোড়া কালী থাকত। এত সুন্দর তাদের অঙ্গভঙ্গি ও সমন্বয়, বোঝা যায় বহুদিনের যৌথ অনুশীলনে একেবারে নিখুঁত কলাকৌশল আয়ত্ত করেছে তারা। নাচের আগে দলের প্রধানের সঙ্গে গৃহকর্তার একটা দফারফা হতো। দর-কষাকষি চলত।
কালী ও মহাদেবের নাচের পর বেদে-বেদেনি সাজা দম্পতি গান ও নাচের মাধ্যমে অনেক হাস্যকৌতুক পরিবেশনা করত। বিশেষ করে, বেদেনিরূপী পুরুষদের শাড়ির আঁচল দুলিয়ে দুলিয়ে হারমোনিয়ামের সঙ্গে গান ও নাচার কথা ভাবলে এখনো আমার বেশ মজা লাগে। কবি গানের লড়াইয়ের মতো কথায় ও যুক্তিতে পরস্পরকে ঘায়েল করার চেষ্টা থাকত তাদের।
চৈত্র মাসের দিনের বেলায় নীল পূজা হতো ঘটা করে। নীল পূজা মানে মহাদেবেরই পূজা। কোনো কোনো জায়গায় একে চড়ক পূজাও বলে। সেদিন ‘হারবিশু’ বলে পরিচিত শিব ও গৌরী সেজে জোড়ায় জোড়ায় দম্পতি আসত লোকের বাসায় বাসায়। গৃহকর্ত্রী তাদের পা ধুইয়ে দিয়ে, খাবার দিয়ে পরম যতœ-আদর শেষে পড়শির বাড়ি পাঠিয়ে দিত। যাবার আগে সঙ্গে দিয়ে দিত চাল, ডাল, আলু। গৌরীর সঙ্গে গৃহকত্র্রী সিন্দুর আদানপ্রদান করত চিরত্রয়োতী হবার আশায়।
চৈত্রসংক্রান্তি কেন্দ্র করে গ্রামে ও ছোট ছোট গঞ্জে বিরাট বিরাট মেলা বসত। মেলায় মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা, নৌকা, কাঠের ঘোড়া, মুড়ি, মুড়কি, লাড্ডু, তিলক, কদমা, নিমকি কত কী উঠত! চৈত্র মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে হয় না। নিষিদ্ধ মাস। ফলে বিবাহে ইচ্ছুক ছেলেমেয়েরা বৈশাখের আশায় বসে থাকত। বর্ষ শেষে খরা শেষে বৈশাখ আসত নবজীবন নিয়ে- আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। বৃষ্টির ধারায়, নতুনের জোয়ারে ভেসে যেত পুরোনো জীর্ণ ও তপ্ত চৈত্রের বাসি দিনগুলো। ভাবি, নতুন যদি সর্বতোই আদরণীয়, বাঞ্ছিত, আর পুরোনো যদি কেবলই পরিত্যাজ্য ও পেছনে ফেলারই যোগ্য, তবু কেন এই পিছুটান? এই ফিরে ফিরে দেখা-গভীর নস্টালজিয়া! গাজন নাচ, চৈত্রসংক্রান্তির ধোয়াপাকলা, চিড়ামুড়ি, তিলের নাড়ু খাওয়া- নীল পূজা, শিব-গৌরীর বাড়ি বাড়ি ভ্রমণ কেন আজও চোখে ভাসে? এও কি বয়সের বার্ধক্যেরই আরেকটি লক্ষণ?
তা না হলে চৈত্রের শেষে বৈশাখের প্রথমে নতুন বছরকে বরণ করতে তখনো তো বাড়িতে বাড়িতে উৎসব হতো! সাধ্যমতো ভালো খাওয়াদাওয়া অর্থাৎ পোলাও-মাংস, মিষ্টি, দই বছরের অন্তত এই একটা দিনে চেষ্টা করত সকলেই জোগাড় করতে। সবার ধারণা, বছরের শুরুতে যা করা হবে, সারা বছর সেই সৌভাগ্যই ফিরে ফিরে আসবে। সেদিন তাই ছোটো ছেলেমেয়েরা আমরা নতুন জামা পরতাম। বছরের প্রথম দিনে নতুন জামা পরে ভালো খাবার খেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবার অজস্র সুখস্মৃতি থাকা সত্ত্বেও কেন জানি আজও নববর্ষের চাইতে ফেলে আসা বছরের কথা অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তির স্মৃতিই আমাকে আনমনা করে পহেলা বৈশাখে। এও কি বয়সের- ফুরিয়ে যাওয়ারই লক্ষণ? নাকি পুরোনো আর নতুনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত!

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here