আমাজান নদীর উৎস কোথায়?॥ সৈয়দ মাহমুদ হাসান মুকুট

0
850

2আমরা নদী দেখলেই চিনতে পারি। আর একটু কষ্ট করে ইতিহাস ঘাটলে ওই নদীর উৎসের ইতিহাসও আমরা জানতে পারি সহজেই। কিন্তু আপনি কি জানেন আজও আমাজান নদীর উৎসমুখ সন্ধান নিয়ে গবেষণা চলছে। বিভিন্ন বই পুস্তক আমাদের জানাচ্ছে যে, আমাজানের ওই নদীগুলো কোনো উচু পাহাড় থেকে এসেছে। যখন বৃষ্টি হয়, বরফ গললে অথবা ভূগর্ভস্থ কোনো ঝর্নার উদগীরণ হলেই পানির ধারার সৃষ্টি হয়। একের অধিক খাঁড়ি একত্রিত হলে সৃষ্টি হয় বড় পানির উৎসে। আর সেই কতগুলো উৎসমুখ একত্রিত হয়ে শেষমেষ নদীর সৃষ্টি করে নিম্নে ধাবিত হয়।
এই থেকে ধারনা করা হয় যে, আমাজান নদী কিংবা নাইল নদীরও উৎস বুঝি কয়েক ডজন বা শতাধিক খাঁড়ি থেকে।
গবেষকরা বিভিন্ন স্থানের উৎসমুখ নিয়ে গবেষণা করলেন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করলেন স্রেফ নদীর উৎস অনুসন্ধানে। কিন্তু শেষমেষ তারা সিদ্ধান্ত নিলেন কিভাবে? স্মিথসোনিয়ানের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস জাদুঘরের ভূতত্ত্ববিদ অ্যান্ড্রু জনসন বলেন, ‘বিভিন্ন গন্তব্য থেকে একটি নদীর উৎসমুখ তৈরি হতে পারে।’ ঐতিহ্যগতভাবে অনেক ভূতত্ত্ববিদ এবং অনুসন্ধানীরা এই নদীর উৎসকে অনেক দূরবর্তী কোনো ধারার সৃষ্টি বলেও দাবি করেন। যদিও নদীর উৎসমুখ নির্ধারণে যে দুটো পন্থা অবলম্বন করা হয় তা পুরোপুরি নিখুত নয়। কারণ স্রোতের ধরণ দেখে একটা সময় যে উৎস নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া ছিল তা পরবর্তী সময়ে গ্রহনযোগ্য হয়নি সকল ক্ষেত্রে। কারণ নদীর বাঁকের কারণেও অনেক সময় স্রোতে তারতম্য ঘটে।
অনুসন্ধানী জেমস কন্তোসের মতে, ‘এই অনুসন্ধানের অন্যতম সমস্যা হলো প্রতি বছরই নদীটির বিভিন্ন শাখার পানির ধাপ কমে বাড়ে। তাই যখন কেউ নদীর উপরের অংশে গিয়ে পরিমাপ করবার চেষ্টা করবেন তিনি একধরনের বক্তব্য দেবেন। নদীর বিভিন্ন শাখায় গেলে ভিন্নধর্মী ফলাফল পাওয়া যায়। দেখা যাবে এক শাখা থেকে উৎস নিরুপন করতে গিয়ে অন্য এক নদীতে চলে যেতে হয়।’ তবে গবেষকদের মতে, বেশ কয়েক বছরের তথ্যাদি হাতে পেলে এবং প্রতিটি শাখার বাৎসরিক পানির ধাপ সংক্রান্ত তথ্য সন্নিবেশ করা গেলে উৎসের কিছুটা কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের খুব কম নদীর উপরই এমন দীর্ঘমেয়াদী কাজ আছে।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এতোদিন পৃথিবীতে নদীর উৎসমুখ নির্ধারণে অধিক পানির আধারকেই ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হতো।
কন্তোসের মতে, ‘ঐতিহ্যগতভাবেই এটা এখনও জানা যায়নি যে কখন এই নদীটির নামকরণ করা হয়েছে। আমরা দেখতে পাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নদীর নামকরণ করা হয় নদীর উৎসের নামের সঙ্গে মিল রেখে।’ প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর অধিকাংশ বড় নদীরই উৎসমুখ আজও পুরোপুরি জ্ঞাতব্য নয়। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় আমাজান নদীর কথা। এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৮৫০ থেকে ৪৩৫০ মাইল। পৃথিবীতে আমাজান হলো সবচেয়ে দীর্ঘ নদীগুলোর মধ্যে একটি। দক্ষিণ আমেরিকার মোট আটটি দেশজুড়ে এই নদী বিস্তৃত। ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, গিনি এবং সুরিনামে রয়েছে এই নদী।
কিন্তু অনেক অনুসন্ধানী গত কয়েক শতাব্দী ধরে আমাজান নদীর উৎস জানার চেষ্টা করেছেন। ১৭০৭ সালে ফাদার স্যামুয়েল ফ্রিট্জ নামের একজন ভূতত্ত্ববিদ লৌরিকোচা লেককে মারানন নদীর উৎস হিসবে চিহ্নিত করেছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মারানন থেকেই আমাজন নদীর অধিকাংশ পানি আসে। এরপর অনেকটা সময় কেটে যায়। ১৯০০ সালে একদল বিজ্ঞানী পেরুর আপুরিমাক নদীর উপরিভাগে পৌছান কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা উৎসমুখ খুঁজে পাননি। তাদের মতে, নদীর উৎসমুখ পরিবর্তনশীল।
এরপর ১৯৬০ সাল। কার্লোস পেনহেরারা  দেল আগুইলা নামের এক পেরুভিয়ান ভূতত্ত্ববিদ পেরুর নেভাদো মিসমি নামের ৫,৫৯৭ মিটার লম্বা পর্বতকে চিহ্নিত করেন আমাজান নদীর উৎস হিসেবে। ওই পর্বত থেকেই নাকি পানি এসে আপুরিমাক নদীতে প্রবাহিত হয়। কিন্তু এর তিন দশক পরে আরেকদল বিজ্ঞানী ওই স্থানে গেলে তারা আর উৎসমুখ খুঁজে পাননি।  এভাবেই অনেক গবেষক-বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেছেন আমাজানের উৎস অনুসন্ধানে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন।
লেখক : সৈয়দ মাহমুদ হাসান মুকুট,
সম্পাদ ও প্রকাশক, মাসিক বিক্রমপুর

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here