আম আদমির সেহরির জন্য বিনিন্দ্র রাত জাগেন ওঁরা : ভোর হল ওঠো রোজাদার আল্লাহ রসুল (সঃ) বোল

0
221

সাকিল আহমেদ, কলকাতা : সারা মাস বিনিদ্র রাত জাগেন ওরা। ওঁদের মায়াবী কন্ঠস্বরে ঘুম চোখে জেগে ওঠেন রোজাদারেরা। গভীর রাতের বৃন্ত থেকে জেগে ওঠে গ্রাম, জেগে ওঠেন আশিকী রসুলের (স:) উম্মতরা। ধনী থেকে মধ্যবিত্ত, দিনমজুর সবাই এই রমজান মাসে ওঁদের নমনীয় কন্ঠস্বরের প্রার্থনায় সাড়া দেন। সেহরি খেয়ে রোজার নিয়েত করে ফজরের নামাজ শেষ করে অনেকেই এলিয়ে দেন বিছানায় শ্রান্ত শরীর। ওঁরা গ্রাম, মহল্লা জাগানিয়া। আব্দুল মান্নান মোল্লা। বয়স ৬৫ ছুঁই ছুঁই। ওঁর সঙ্গী নাজমুস সাহাদাত মোল্লা, হাজি নসিম আলি পাইক, হাফিজ গিয়াসউদ্দিন মোল্লা। সবাই রাত জাগেন। ডায়ম- হারবারের ষাটমনিষা গ্রামের জামে মসজিদ থেকে দূরের বলাকার মত ভেসে ওঠে ওদের সুমিষ্ট কন্ঠস্বর। প্রায় ৪ হাজার রোজাদার আরো কয়েক হাজার হিন্দু-মুসলমানের বাস এই ষাটমনিষা গ্রামে। দশ পনের বছর আগে গ্রামের মসজিদে মাইক ছিল না। চোঙা ফুকিয়ে রাত পৌনে দুটো নাগাদ উঠে ওরা গ্রাম জাগাতেন। ‘ভোর হল ওঠো রোজাদার / আল্লাহ রসুল (সঃ) বোল, সেহরি খাবার সময় হল / এবার খোলো দোর / দিনে দিনে দিন ফুরায়ে এল যে রে তোর / রোজহাসরে কেমন করে মুখ দেখাবি তোর  / সিহরি খাবার সময় হল এবার খোল দোর।” এই গজল গাইতে গাইতে হাতে হ্যাজাক লাইট, টর্চ এবং গ্রামে সাপের উপদ্রব রুখতে রানারের মত লাঠি হাতে গ্রাম জাগাতেন ওরা। এখন কিছুটা শান্তি। মসজিদের ভিতর রাত জেগে ওরা ঘুম ভাঙান রোজাদারদের। মাইকে ঘোষণা দেন আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি আছে। এই মাত্র শেষ হল সেহরির সময়। মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রোজার নিয়ত শুরু করেন।
ষাটমনিষা গ্রাম বাড়তে বাড়তে বাসুলডাঙ্গা, বড়িয়া, বোলসিদ্ধি দগিড়া, মরুইবেড়িয়া ছুঁয়েছে। সরলরেখায় বয়ে গেছে শিয়ালদা ডায়ম- হারবার রেলের লাইন। সংযমের এবং ইবাদতের এই মাসে ওরা রাতে ঘুমান মাত্র দুই আড়াই ঘন্টা।
মসজিদে চলছে খতমে তারাবিহ নামাজ। ফলে নামাজ শেষ হতে বেজে যায় রাত দশটা পনের। তারপর রাতের আহার। ঘুম পরী এসে টেনে নিয়ে যায় চোখের কোন। ঘড়িতে কিংবা মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হয় রাত পৌঁনে দুটো। ঘুম চোখ ছাড়িয়ে ওজু করে মসজিদের দরজা খুলে রাত দুটো থেকে শুরু হয়ে যায় সেহরির জন্য হাঁকা। সেহরি শেষ তিনটে বাইশ মিনিট। সেই দিনক্ষণ প্রতিদিন শেয়ার বাজারেরত মত ওঠানামা করে। মান্নান, নাজমুসদের সে দিকে সজাগ থাকতে হয়। সময়ের উল্টোপাল্টায় অনেকের রোজা নষ্ট হতে পারে।
হিন্দু-মুসলমানের বসবাস এই গ্রামে হিন্দু-ভাইবোনেরা জেগে ওঠেন। সবজি বিক্রেতারা তৈরী হয়ে যান ভোরের ট্রেনে পসরা নিয়ে শহর মুখী হওয়ার। ডা: ইলিয়াস আলি সরদার ক্যান্সারে ভুগছেন। কেমো নিতে হয় তাঁর। স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা বেগম স্বামীর সেবা করেও ভোরে সেহরি খেয়ে রোজা রাখেন। পাশেই বাড়ি প্রিয়াঙ্কা দাস, রাজু দাস, তাপস খামারু, সনৎ খামারুদের।
একদিন সেহরির সময় বেঘোর ঘুমে অচেতন ফজিলা বেগম। পাশের বাড়িতে ওদের ঘুম ভেঙে গেছে। তাকিয়ে দেখেন আলো জ্বলছে না। স্বামীর সেবা করে গভীর ঘুমে তখন রোজাদার ফজিলা বেগম। পাশের হিন্দু বাড়ির কড়া নাড়া। ভাবি উঠবে না। রোজা করবে না, মাইকে অনেকক আগে হেঁকে দিয়েছে মসজিদ থেকে। হিন্দু প্রতিবেশীর ডাকে ঘুম ভাঙে ফজিলার। সেহরি খেয়ে পরদিন রোজা কাজা হয়নি তাঁর। ধন্যবাদ প্রতিবেশী।
গ্রাম থেকে গ্রাম সারা বাংলা, বিশ্ব বাংলা আল্লার নিয়ামতের দিকে তাকিয়ে, মহব্বতের দিকে তাকিয়ে এই সংযম মাসে রোজা পালন করেন রোজাদারেরা। আর তাঁদের ভোরে ঘুম থেকে উঠতে এরকম গ্রামের পর গ্রাম মানুষ জেগে ওঠে। বিশ্বপ্রতিপালকের ইবাদতে। সারামাস পরিশ্রমের পর ওদের জোটে প্রতি বাড়িতে মুষ্টি মুষ্টি চাল, তাই দিয়ে ঈদের পরদিন চলে আনন্দের ভুরি ভোজ। সারা মাসের রাত জাগা কষ্টের পর আর এক বছর অপেক্ষা মাহে রমজানের।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here