হবিগঞ্জের বিথঙ্গল আখড়া এখন পর্যটক মূখর

0
43

মোঃ মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ : বিথঙ্গল আখড়া। এস্থানটির নাম আসলেই কয়েকশ বছর পূর্বের ইতিহাস চলে আসে। এ কথা জানতে কমবেশী সবাই আগ্রহ জাগে। নিজ চোখে দেখার পর জানার মধ্যে অন্য রকম তৃপ্তি পাওয়া যায়।

তাই দেশের কোনস্থান থেকে এখানে যেতে চলে আসতে হবে হবিগঞ্জ শহরে। শহর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার অতিক্রম করে কালারডুবা খেয়াঘাটে আসতে হবে। সেখান থেকেই ট্রলার ভাড়া করে প্রায় ১৬ কিলোমিটার ও বানিয়াচং উপজেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার হাওর এলাকা অতিক্রম করে গিয়ে বিথঙ্গল আখড়ার দেখা মেলে। তবে হাওরে পানি শুকিয়ে গেলে যাওয়াটা একটু কঠিন হয়ে পড়বে। এ সময় যেতে হবে গাড়ী ও পায়ে হেঁটে।  এ স্থানটি পরিদর্শন করতে শহর থেকে কালারডুবা ঘাটে পৌঁছাতে হবে। ট্রলার যোগে যেতে প্রচন্ড রোদে মিষ্টি বাতাসের তোড়ে মনে প্রশান্তি চলে আসবে। পথে যেতে যেতে স্বচ্ছ পানিতে দৃশ্যমান পানির জগৎ আর বুক পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা হিজলগাছ অপরূপ লাগবে। এসব দেখতে দেখতেই বিথঙ্গল এসে পৌঁছা যাবে। এরমধ্যে অতিবাহিত হয়ে যাবে প্রায় দুইঘন্টারমত সময়। ঘাট থেকে আখড়ায় যেতে পায়ে হেঁটে ৩ থেকে ৫ মিনিটের পথ। অবশ্য ঘাট থেকে নেমেই আগে চোখে পড়বে একটা জমজমাট বাজার। বাজার পেরিয়ে আখড়ার সামনে বিশাল পুকুরের ঘাটলায় লোকজন গোসল করছেন। প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে যেতেই লেখা জুতা খুলে প্রবেশ করুন। নিয়মমতেই সবাই প্রবেশ করছে। আবার আখড়ার মূল যে মন্দির সেখানে প্রবেশ নিষেধ ভিন্ন ধর্মানুসারিদের।

বিশাল এই আখড়ায় মোট কক্ষ আছে ১২০টির মতো। লোকমুখে জানা যায় কক্ষগুলোতে ১২০ জন বৈষ্ণব থাকতেন। তবে বর্তমানে পূর্বের ন্যায় বৈষ্ণব বসবাস করছেন কয়েকজন। বড় বিষয় হল প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ এই স্থাপনাটি দেশের অন্যসব পুরনো স্থাপনার মতোই খুব করুণ। জরাজীর্ণ ভবনগুলো যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। তাই এখনই কয়েকশ বছরের পুরনো এসব স্থাপনা সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে বলে ভ্রমণ পিপাসুরা মত প্রকাশ করেছেন।

আখড়াতে দুপুরে ভক্তদেরকে এক প্রকার প্রসাদ দেওয়া হয়। অনেকটা সবজি আর খিচুড়ির মিশ্রণ। এসব খেয়ে ভক্তরা অসাধারণ স্বাদ পান। এখানে পর্যটকরা মূলত আসেন আখড়া দেখার জন্য। সাথে হাওরের প্রাকৃতিক দৃশ্যটাও তাদের দেখা হয়ে যায়। তাই শতকষ্টেও ইতিহাস সমৃদ্ধ এ আখড়ায় পর্যটক আগমণ হচ্ছে। দিন দিন তাদের (পর্যটকদের) কাছে এ স্থানটি প্রিয় হয়ে উঠছে।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, উপ-মহাদেশের বিভিন্ন তীর্থস্থান সফর শেষে কম হলেও ৬০০ বা ৪০০ বছর পূর্বে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ গোস্বামী বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিথঙ্গলে এসে এই আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন।  এতদঞ্চলের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র এ আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ গোস্বামী হবিগঞ্জের রিচি পরগনার অধিবাসী ছিলেন। বাংলা ১০৫৯ সনে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ গোস্বামীর দেহত্যাগ হয়।

আখড়ায় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ গোস্বামীর সমাধিস্থলের উপর একটি সুদৃশ্য মঠ প্রতিষ্ঠিত। মঠের সামনে একটি নাট মন্দির এবং পূর্ব পার্শ্ববর্তী একটি ভান্ডার ঘর এবং দক্ষিণে একটি ভোগ মন্দির রয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকটি পুরাতন ইমারত আছে।

যদিও সরকারি অর্থানুকূল্যে আখড়াটি সংস্কারের যে কাজ করা হয়েছে তা অপ্রতুল ও নিম্নমানের। বিশেষ করে সংস্কারকালে আখড়ার প্রাচীন সৌন্দর্য্য রক্ষায় কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ফলে দিন দিন আখড়ার ঐতিহাসিক রূপ হারিয়ে যাচ্ছে।

আখড়ায় পালিত উৎসবাদির মধ্যে আছে কার্তিক মাসের শেষ দিন ভোলা সংক্রান্তি কীর্তণ, ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোল পূর্ণিমার ৫ দিন পর পঞ্চম দোল উৎসব। চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে ভেড়ামোহনা নদীর ঘাটে ভক্তগণ স্নান করেন। স্নানঘাটে বারুনীর মেলা ও আষাঢ় মাসে ২য় রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি উৎসবে হাজার হাজার ভক্ত যোগদান করেন।

আখড়ায় অনেক দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে রয়েছে ২৫ মণ ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকি, পিতলের সিংহাসন, রথ, রৌপ্য নির্মিত পাখি, মুকুট ইত্যাদি।

স্থানীয় লোকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, সাধারণত শরৎকালেই এখানে যাওয়ার জন্য ভালো সময়। বর্ষার বিদায়ী আমেজটা উপভোগ করা যায়। তাছাড়া তখনও ভরপুর পানি থাকে হাওরজুড়ে। অবশ্যই পূর্ণিমার সময়টা খেয়াল রেখে যাওয়ার আয়োজন করা উচিৎ। কারণ ভরা চাঁদের আলো ছাড়া পুরো ভ্রমণই অপূর্ণ রয়ে যাবে। যেহেতু এই আখড়াটি হাওরের মাঝে ছোট্ট গ্রামে অবস্থিত, তাই থাকার জন্য নেই কোনো হোটেল। তবে হবিগঞ্জ শহরে এসে থাকার জন্য হোটেল রয়েছে। বিঙ্গল বাজারে খাওয়ার সুবিধা আছে।

আখড়ার কর্তৃপক্ষ জানান, আখড়ার নিজস্ব ৪০ একর জমির উৎপাদিত ফসল ও ভক্তদের দানে যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হয়। ভক্তরা প্রতিদিন রোগবালাই হতে পরিত্রাণের জন্য আখড়ায় আসেন। উপজেলা কিংবা জেলা সদরের সাথে বিথঙ্গলের উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী প্রাচীন এ আখড়া পরিদর্শন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে হচ্ছে হচ্ছেন। তারপর পর্যটকরা এখানে আসছেন। প্রাচীনতম এ ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি সংরক্ষণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেছেন আগত পর্যটকরা ও এলাকাবাসী।

২৮ জুলাই ২০১২ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের এক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এর নেতৃত্বে বিথঙ্গল আখড়া পরিদর্শন করেন। সে সময়ে বাপা নেতৃবৃন্দ এই আখড়া রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন। শত শত বছরের প্রাচীন এই নান্দনিক আখড়া রক্ষায় এখনই জরুরী উদ্যোগ প্রয়োজন। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বরও এ আখড়া পরিদর্শন করেছেন বাপা নেতৃবৃন্দ।

বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জিত কুমার সিংহ বলেন, বিথঙ্গল আখড়া ইতিহাস বহন করছে। এটি পরির্দন করতে দেশের নানা প্রাপ্ত থেকে লোকজনের পদচারণ হচ্ছে। এটি রক্ষায় আমরা কাজ করছি।

বাংলাদেশ  পরিবেশ আন্দোলন(বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, এটি হবিগঞ্জতথা পুরো দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করছে।  এ আখড়ার পুরাতন ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোন সময় ভেঙ্গে যেতে পারে। তাই জরুরী ভিত্তিতে সরকারী উদ্যোগে সংস্কারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

 

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here