ছবি গল্প

0
432

কাজিম রেজা    
রাস্তা পার হয়ে দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে। ওড়না ঢাকা মাথা, পুবমুখো, দু’হাত মেলা। মনে হতে পারে নরম ভঙ্গিতে নরম সকালে নিরীহ এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। আমি জানি পথ আটকে আছে। সামনে বাড়তে চাইলে আমার বরাবর সমান তালে পিছু হাঁটবে অথবা খপ করে সামনে এসে হাত ধরে টানাটানির ভঙ্গি করবে। না হয় শরীর সামান্য ফাঁক রেখে পাশে পাশে হাঁটতে থাকবে। ভাবখানা আমার কথা শুনে হাসছে। বিড় বিড় করে হাসিমুখে কিছু বলছে বা হেসে হেসে জবাব দিচ্ছে। আমি এখন পশ্চিমে যাব। পাশ কাটানো যাবে না। ফুটপাত থেকে নামতে গেলে ও সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবে। একটু দাঁড়াই। একটা উপায় বের করি। জানি ও দাঁড়িয়ে থাকবে।
ঠিক দু’দিন আগে রমনা পার্কের পাশ ঘেঁষে হেঁটে শাহবাগের দিকে যাচ্ছি। পাশে ও। খেয়াল করিনি। ফুটপাত ঘেঁষে থেমে যাওয়া এক গাড়ি থেকে পরিচিত ব্যাংকারের ডাকে তাকাই। প্রথমবার ভুল করে ডানে তাকিয়ে দেখি সেই মেয়ে। গাড়ির কাছে গেলেই তিনি বললেন, ‘দুপুরে লাঞ্চ করব একসঙ্গে, চলে এসো। খবর আছে।’ কথামতো যাই তার কাছে। খেতে খেতে বললেন, মেয়েটা কে?
আমি চুপ থাকতে তিনি বললেন, ভুলে গেলে এর মধ্যে। ছিপছিপে ঝকমকে এমন মেয়েকে ভুলে যাওয়া সাধকের লক্ষণ… জানো আইনস্টাইন যে কাজটি করতেন তাতেই মশগুল থাকতেন। বেচারা আমাদের মতো প্রতিভাবান ছিলেন না তো তাই স্বপনে কিছু পেতেন না!
কোনো টেনশনে আছ নিশ্চয়ই… ওই যে লম্বা মেয়েটি… মিষ্টি হেসে কিছু একটা জবাব দিচ্ছিল আর তুমি শোক প্রস্তাব পাঠ করার মেজাজে ছিলে, ভালো মেয়ে ভালো মেয়ে…।
তার ব্যাংক থেকে বেরিয়ে সোজা অফিসে ফিরি।
আজ কি করব এই সকালে? ওর হাত থেকে ফসকানোর বুদ্ধি বের করতে পারছি না। পরনে সম্ভবত রাতের পোশাক। কামিজটি গলা ঢাকা। তবে গলার নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত সামনের পার্ট ফিনফিনে সি থ্রু কাপড়ে তৈরি। ধারালো শরীর আয়নার চেয়েও স্পষ্ট।
অন্তর্বাস নেই…। মাথা ঢাকা ওড়নাটি ভারী ও বড়। শরীর-মাথা এক ওড়নাতে ঢাকা যায়।
লাইনের খুব কম মেয়ে এ জাতীয় কাপড় পরে রাস্তায় নামে। ওরা রং-ঢং করে। শরীর শক্ত করে বাঁধা থাকে, গলা বড়। শক্ত বাঁধনে উপচে থাকায় প্রদর্শন সুবিধা পাওয়া যায়। পিনআপ ম্যাগাজিনের মতো। বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেবে কিন্তু অরেকটু এগোতে চাইলে পকেট দেখতে হবে।
একদা বেলি চৌধুরীর ওপর একটা স্টোরি করতে গিয়ে আমাকে তৈরি করে দেয়া ডিবির বি জামান সাহেবের নোট থেকে বিষয়টা জানি। তার চাকরি থেকে অকস্মাৎ বিদায় নেয়ার আগে, টালমাটাল দিনগুলো তখনও শুরু হয়নি। স্বাভাবিক দিনগুলোতে তিনি নিজ থেকে কেন যেন আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন! একদিন বললেন, ‘শোনেন সাংবাদিক সাহেব, ওসমানী তরিকার হলে ক্রাইম বুঝতে পারবেন না।’
মানে?
‘কোনো মানেটানে নাই। বিয়ে করেন ক্রাইম বোঝেন।’
খুলনার এই ভদ্রলোকের ছিপ দিয়ে মাছ শিকারের বেজায় শখ ছিল। তাকে আমি ঢাকা, গাজীপুর আর নারায়ণগঞ্জে পারিবারিকভাবে ব্যবহৃত দশ-পনেরটা পুকুর আর দীঘির ঠিকানা এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। ওইসব এলাকায় যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার বিশদ বিবরণও লিখে দিয়েছিলাম। তিনি বেশ খুশি হয়েছিলেন। এরপর থেকে ভদ্রলোক আমাকে রাজ্যের খবর, ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি, যখন যা পেতেন দিয়ে যেতে থাকেন। ঢাকায় দেহ ব্যবসার বিবর্তন সংক্রান্ত তিনি একটি মৌলিক গবেষণাপত্র তৈরি করেন যা আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল অবসর নেয়ার পর এ বিষয়ে একটি তথ্য সমৃদ্ধ বই লেখবার। আর এ ব্যাপারে অন্যতম গাইড ছিলেন সাব ইন্সপেক্টর আজাদুর রহমান খান। আজাদ ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানীতে বিশাল এক সরকারি পরিত্যক্ত ভাড়া বাড়ির দোতলায় গড়ে ওঠা প্রথম মধুকুঞ্জ ভাঙেন। তথ্য যাচাই শেষে আমার অনুসন্ধানমূলক একটি সিরিজ রিপোর্ট হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল।
এখন বিবেচ্য বিষয় হল, মেয়েটি রাস্তা থেকে সরছে না। এই ভোরে কি করি! তখনি মনে পড়ল সঙ্গের ক্যামেরাটির কথা। তুলে নিলাম হাতে। চোখে তোলার আগে এক লাফে সরে গেল সে। শুনলাম, ওর হিসহিসে কণ্ঠ, আমার সঙ্গে রং কর। তৈরি থাইক, মায়ের ভাতের মজা ভুলায়ে দিমু। আমি মুচকি হেসে রিকশায় উঠলাম। আজ এত ভোরে ও পথ বন্ধ করেছিল। এ সময়ে ওদের দেখা যায় না। কিন্তু বান্দা হাজির। মেয়েটি কি আসলে লাইনের মেয়ে?
আগস্ট মাস শুরু হয়েছে। তত্ত্বাবধায়কের চোটপাট চলছে। কোনো জায়গায় হোঁচট না খাওয়া পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকবে সবাই বোঝে। আমার সঙ্গে আজ সকালে এক সচিবের রমনা পার্কে কথা হবে। দূরের এক ভাইকে দিয়ে খবর দিয়েছিলেন। দেখা হলে অস্বাক্ষরিত একটি প্রিন্ট আউট পাব পূর্ব নির্ধারিত রদেঁভুতে ।
না, মেয়েটিকে মাথা থেকে নামাতে পারছি না। আবার মনে পড়ল পথের কাঁটার কথা!
রাস্তার ওই মেয়ে আমার কাছে কি চায়? কান্দুপট্টি উঠিয়ে দেয়ার জ্বালা হয়েছে এই। ঢাকার কোথাও কোনো রেড লাইট বেস নেই। শুধু কি ঢাকায়? নারায়ণগঞ্জ, আশপাশের কোথাও ওসব কিছু নেই। ভেজাল রাস্তার ওপর, ঘাঁপেঘোপে, নিুবিত্তের বাসায়, উচ্চবিত্তের ফ্ল্যাটে। এ মেয়েটি কোথায় বসে ঠিক জানি না। মেয়েটি কোথায় নেই? প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে শিশুপার্কের উল্টো গেট বরাবর রাস্তা, রমনা পার্ক সব জায়গায় ওকে দেখি। আমাকে দেখলেই হল, কেমন গোঁত্তা মেরে কাছ ঘেঁষতে চায়। কাউকে বলতে পারছি না, বুঝতে পারছি। জানাজানি হলে হাসির পাত্র হব।
জোর করে মাথা থেকে ওকে বিদায় দেই।
আজ ভোরে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। কেউ পানি পথ ভেঙে একটানে কাকরাইল আসতে রাজি নয়। অগত্যা বাসা থেকে কমলাপুর রেল ওভারব্রিজ পর্যন্ত ভেঙে আসি রিকশায়। ওভারব্রিজ দিয়ে হেঁটে স্টেশনের পাশ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড়ে আসি আরেক রিকশায়। তৃতীয় চালকের রিকশায় সোজা প্রেস ক্লাবের সামনে।
পার্কে ঢুকে দেখি শিশুপার্কের কোনায় হাফিজ সাহেব গুনগুন করে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। বসলাম তার সামনে- বললাম এ গেটে লোকজন মানে লাল ক্যাপ পরিহিত কেউ এসেছিলেন? হাফিজ সাহেব পড়া বন্ধ করে বললেন, আমার পরে আপনি দ্বিতীয় ব্যক্তি এখানে ঢুকলেন। প্রার্থিতজন এলেন আরও পরে। ভদ্রলোক যথারীতি যেভাবে সব ঠিক করা হয়েছিল তাই করে চলে গেলেন। আমি কাগজ তুলে নিলাম।আবার মাথায় এলো মেয়েটি। ওকে থামাই কীভাবে? পুরো ঘটনাটা বস্টনবাসী আজাদুর রহমানকে জানাব। আজাদ ভাই এএসপি হওয়ার পর পুলিশ মিশনে জাতিসংঘের ডিউটি করে ফিরে এসে চাকরি ছেড়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। যাই করি, আগে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে হবে।আমি রমনা পার্কের ওদের পরিচিত জায়গাতে সন্ধ্যায় ঢুঁ মারতে যাই। এখানেই মাঝে মাঝে ওরা কেউ কেউ ঘোরাঘুরি করে। বাইরে গেলে ফেরত এসেও কখনও ভিড় জমায়। না, ওর দেখা নেই।পরিচিত মুখের এক মেয়ে জিজ্ঞেস করে কারে চান? জানালে বলে, ‘ওতো ছবি’। আপনার খোঁজেই তো হ্যায় দিওয়ানা হওয়ার পথে’! ঘণ্টা খানেক আশপাশে ঘোরাঘুরি করে আবার ঢুঁ মারলাম ওখানে। এখনও আসেনি। চলে আসব, দেখি ছবি আসছে। ওকে বললাম, তোমার সঙ্গে কথা বলব তুমি জায়গা ঠিক কর। এক সপ্তাহের মধ্যে জানাবে। রাস্তায় হাত টানাটানি, ডাকাডাকি করবে না। কিছুটা অবাক হয়ে গেল। কোনো কথা বলল না। মাথা নাড়ল।
ছবির সঙ্গে আজ কথা হবে। পার্কে নয় ওর ঠিক করা এক বাসায়।
গত সপ্তাহে বোস্টন থেকে আজাদ ভাইয়ের মেল পাই। তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ডিআইজি র‌্যাংকের এক অফিসারের নাম, মোবাইল নাম্বার, ইমেইল আর টিএনটি নাম্বার পাঠিয়ে লিখেছেন, তার কাছে যাবেন সব কথা জানিয়েছি। এর মধ্যে সাত দিন পর কথামতো পার্কে এসে ছবির কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে গেছি। মেয়েটি ভারী অদ্ভুত! একটি কথাও বলল না। আমার দেয়া শর্ত মেনে চলা শুরু করেছে। বেঞ্চে বসা ছিলাম। পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় একটুকরা কাগজ ফেলে চলে গেল। কুড়িয়ে নিয়ে দেখি তাতে র‌্যাংকিন স্ট্রিটের একটি বাড়ির ঠিকানা দেয়া। পাকা হাতের লেখা। আমাকে ছবির নাম বলে দেয়া সেই মেয়েটি দূর থেকে হেঁটে আসছিল তখন। মেয়েটি আমাকে শুনিয়ে ছবিকে বলল, কিরে বনল না। কী পাগলটা না হইছিলি? ওই বান্দরের খোঁজে তোর দোকান তো প্রায় বন্ধ করে দিছিলি। যাউগ্যা শইলের ঝাঁপ তোল আবার!
আজাদ জানিয়েছেন, ওর বন্ধু ঢাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ওটা ভদ্রলোকের বাড়ি। ঝামেলা হবে না।
‘আপনাকে মেয়েটি ট্রাপে ফেলে নি তো, যদি না ফেলে থাকে তাহলে যার পরিণতি নেই এমন একতরফা প্রেমে মেয়েটি জড়িয়েছে’- আজাদ ভাইয়ের অনুমান। বিপদের কথা এইটিই।
আমি সন্ধ্যার পর র‌্যাংকিন স্ট্রিটে যাই। বেল বাজানোর পর দরজা খুলে দেয় শাড়ি পরা ছবি। পাশে ছবির মতো দেখতে তবে ওর চেয়ে অনেক সুন্দর আরেক তরুণী। পা ছুঁয়ে সালাম করে বলে ভাই, আমি নাফিসা। ঘরে আসুন। সোফায় বসার পর নাফিসা বলে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে একা বাড়ি ফিরতে গিয়ে দু’বছর আগে রমনা পার্কের সামনে বড় বিপদে পড়েছিলাম। পুলিশের লোকে আমার গাড়ি আটকে দিয়েছিল। মনে করেছিল আমি কোনো নারী পাচারকারী দলের সদস্য। এখনও মনে করলে হাত পা ঠা-া হয়ে আসে। সে সময় কীভাবে যে রাস্তায় দাঁড়ানো ছবি বাঁচিয়েছিল! ওকে একদিন ওখান থেকে খুঁজে বাড়িতে নিয়ে আসি। আব্বার পিড়াপিড়িতেই ওকে আনি। ছবি নিজের পরিচয় দিতেই আব্বা বলেন, ‘আমি ওসব শুনতে চাই না। তুমি আমার মেয়ের ইজ্জত বাঁচিয়েছ। তুমিও আমার মেয়ে। মেয়েটি শুনে হুঁ হুঁ করে শুধু কাঁদল। ও বোরকা পরে এখানে আসে।
নাফিসা বাসায় দু’দিন যাবৎ একা। বাড়ির সবাই গেছে ওর খালাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে। আর ও এখন যাবে কাছে আরেক খালার বাড়ি। ও বলে গেল নিশ্চিন্তে থাকুন। আসব দু’ঘণ্টা পর।
ছবি একদম শান্ত। কথা বলছে খুব কম এবং আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে পুরো শুদ্ধ বাংলায় বলল, আমি এ বাসায় প্রথমবার আসার পর মনের অশান্তি আরও বেড়ে যায়। তখন রাস্তায় আপনাকে দেখি। আমি নানাভাবে আপনাকে আকর্ষণ করতে চেয়েছি শুধু একটু কথা বলব বলে। আমাদের দু’জনের মধ্যে আর কথা এগোয়নি।
ছবি বলল নাফিসা আপার টিএন্ডটি নাম্বার নিয়ে রাখেন। আমি আবার দেখা করতে চাইলে জানিয়ে দেব। বলেই হাসল। অর্থাৎ ওর ইচ্ছার সঙ্গে সুর মেলাতে হবে! এরপরই ছবি আমাকে বেশ অবাক করে নাফিসা আসার আগে চলে গেল। মেয়েটি এত ঘামছিল!
নাফিসা এসে ছবি নেই শুনে অবাক। এরপর দু’জন প্রায় একসঙ্গে পরস্পরের কাছে বলে উঠি, মেয়েটি কে? উভয়ে বললাম, জানি না। আমি জানতে চাইলাম পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন কেন, জানি না। মেয়েটির সঙ্গে মেশার পর প্রতিবারেই কেমন যেন ওকে আগের বারের চেয়েও ভালো লাগে। আপনি নিশ্চয়ই খুব ভালো মানুষ হবেন। নইলে ওর মনে ধরল কেন? আমি শুনে বেকুব হয়ে গেলাম। মনে মনে বলি, মেয়ে তোমার কপালে খারাবি আছে! দুনিয়া এত সহজে বুঝে নিতে চাও।
চলে আসার আগে নাফিসাকে আমি বলে আসি, আগস্টের শেষ শুক্রবার আবার আসব। ছবি ফোন করলে জানিয়ে দেবেন।
ছবির সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হয়নি।
দ্বিতীয় দফায় দেখা করার নির্ধারিত সময়ের আগে রমনা পার্কে যেতে হয়েছিল।
ওখানেই শুনলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাট হাঙ্গামা হচ্ছে। পুরো পার্ক প্রায় জনশূন্য। ছবিকে চেনে এমন একটি মেয়ে বলল, আজকে আমরা কোনো কাস্টমার নেব না। ছবি আপা আমাদের সবাইকে এক জোট করে কইছে ছাত্রদের মাইরা ফেলছে ওরা। তোদের যত বন্ধু আছে ইউনিভার্সিটিতে যেতে বল। একদিন না খেয়ে থাকলে মরে যাব না। কাস্টমারদের ফিরিয়ে দে। বলিস মুরোদ থাকলে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে। সারা জীবন যা গুনাহ কামাইছিস যদি ওপরঅলা এ উছিলায় মাফ করে দেন!আমি দ্রুত ফিরি অফিসে। হেঁটে আসতে আসতেই দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। কেউ কেউ বলছে কারফিউ জারি হয়েছে। বিভাগীয় প্রধান আমাকে বলেন, দ্রুত বাসায় চলে যান। পাঁচজনের একটি ইমার্জেন্সি গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে আপনি আছেন। কয়েকজন কলিগ দূরে থাকায় নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে ওদের কয়েকদিন অফিসে আসতে নিষেধ করা হয়েছে।
আমাকে অফিসের গাড়ি বাসা থেকে পরদিন তুলে নিয়ে আসে।অফিসে মেল চেক করে দেখি অজ্ঞাত কেউ একজন, মেসেজে রমনা পার্কে আমাকে যেতে নিষেধ করেছেন। সরকার ইউনিভার্সিটির গোলমালে বাইরে থেকে ইন্ধন জোগানো হয়েছে বলে অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে। এদের সঙ্গে নাকি রুপোজীবীর পরিচয়ের আড়ালে একদল নারী সেবোটিয়ার যুক্ত হয়। এদের কারো কারো নামও জানা গেছে। ছবি, মিনতি, কাকলীসহ ত্রিশজনের সংঘবদ্ধ একটি রাষ্ট্রবিরোধী চক্র র্কতৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় আটক একজন হৃদরোগে প্রাণ হারিয়েছে। বিবরণ পড়ে কেন যেন মনে হল নিহত মেয়েটি ছবি। কেননা ওর কোনো সঙ্গী একসঙ্গে ধরা পড়লে নিজেই পুরো ঘটনার দায় একা নিজের মাথায় তুলে নেয়ার মতো মেয়ে সে। আমি বুঝতে পারি আজাদ ভাই এ ইমেইলে বার্তা পাঠিয়েছেন। এসব তথ্যের কিছুই সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। একবার, দুবার, তিনবার বার্তাটি পড়ি। মাথা ফাঁকা লাগছে। কিছুই ঢুকছে না। আশ্চর্য ছবি মনে এতটা গেঁথে গেছে ভাবতেও পারিনি। মনে হল নাফিসাকে খবরটা জানানো দরকার। ও যেন ছবির খোঁজে কারফিউ তুলে নেয়ার পর কোথাও না যায়। টিএন্ডটি, মোবাইল করব না। জানি না কে কোথায় বসে শুনছে। অফিস থেকে কয়েকঘণ্টা ছুটি নেই। ফাঁকা রাস্তায় নামি। কারফিউ পাস সম্বল। অনেকবার বেল টেপার পর দরজা খোলে নাফিসা। ভীত কণ্ঠে বলল, বাসায় কেউ নেই। আমি ছবির নাম বলতেই ও ভেতরে আসতে বলে। সব শুনে পাথর। কতক্ষণ বসে আছি জানি না । নাফিসা কাঁদছে। অনেকক্ষণ পর বলল, আমি ওকে খুঁজব। যতদিন লাগে লাগুক, ওকে খুঁজে বের করব।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here