আমাদের সংগ্রামী অভিযাত্রার আলোক মানব

0
48

শাহ মতিন টিপু : জহির রায়হান আমাদের সংগ্রামী অভিযাত্রার আলোক মানব। জহির রায়হান শুধু এদেশের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাই নন, আমাদের কথাসাহিত্যেরও তিনি একজন অগ্রগণ্য ব্যাক্তিত্ব। সর্বক্ষণ সৃষ্টির প্রেরণায় অস্থির এই মানুষটি চলচ্চিত্র ও সাহিত্য এই দুই অঙ্গনেই ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। আর দুই ক্ষেত্রেই তিনি তার প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রবলভাবে দায়বদ্ধ একজন মানুষ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সংগ্রামী অভিযাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে তিনি কেবল আলো হাতে জাতিকে পথই দেখাননি, ইতিহাসের বাঁকগুলো বাক্সময় হয়ে উঠেছে তার রচনায়।
এই প্রতিভাবান মানুষটির জন্মদিন ১৯ আগস্ট । ১৯৩৫ সালের এইদিনে তিনি ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। পিতা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক ছিলেন। জহির রায়হানের মাতা সৈয়দা সুফিয়া খাতুনের প্রথম সন্তান শহীদুল্লাহ কায়সার, দ্বিতীয় নাফিসা কবির, তৃতীয় জহির রায়হান, চতুর্থ জাকারিয়া হাবিব, পঞ্চম সুরাইয়া বেগম, ষষ্ঠ শাহেনশা বেগম, সপ্তম ওবায়দুল্লাহ, সর্বকনিষ্ঠ সাইফুল্লাহ।
পেশায় সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহ্যিতিক। তার লেখা সারেং বৌ (১৯৬২) ও সংশপ্তক (১৯৬৫) উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। পিতা ও মাতার বংশের সত্যঘটনা অবলম্বনে তিনি সংশপ্তক উপন্যাস লিখেছেন, জানিয়েছেন তার বোন শাহেনশা বেগম। তাছাড়া ‘পেশেয়ার থেকে তাসখন্দ (১৯৬৬)’ ভ্রমণ কাহিনী ও স্মৃতিকথা ‘রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২)’ তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর আল-বদররা নিজ বাড়ি থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বড় ভাই বিজয়ের দুদিন আগে, আর জহির রায়হান হারিয়ে যান বিজয়ের অব্যবহিত পর। তার অন্তর্ধান জাতির জন্য ছিল চরম বেদনার। এই অন্তর্ধানে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প ও কথাসাহিত্য দুটোই রিক্ত হয়েছে। মাত্র ৩৬ বছরের পরমায়ু নিয়ে চলচ্চিত্র ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই তিনি তার প্রতিভার ও সৃষ্টিশীলতার যে নজির রেখে গেছেন, তাই তাকে অমর করে রাখবে। চলচ্চিত্র প্রতিভার পরবর্তী আশ্রয়স্থল হলেও তার আবির্ভাব ঘটেছিল কথাসাহিত্যে। সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, রাজনৈতিক কর্মী, চিত্রপরিচালক নানা পরিচয়ে তার কর্মক্ষেত্রের পরিধি স্পষ্ট।
জহির রায়হান স্কুল জীবন থেকে কবিতা লিখতেন। লিখতেনও অবলীলায়। ছোটবেলা থেকেই তার লেখার অভ্যেস। লিখতেন, ছিঁড়তেন আর পড়ে শোনাতে ভালোবাসতেন। প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরাই ছিলেন তার রচনার একনিষ্ঠ শ্রোতা। জীবনের বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ ছিল তার।
তার প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’। নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে এই উপন্যাসে। এরপর ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের দুঃখ-দারিদ্র, সংস্কার-সংকীর্ণতা প্রেম-এই উপন্যাসের মূল বিষয়। পরবর্তী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’। উপন্যাসটি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে রচিত। এরপরের উপন্যাস যথাক্রমে ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কতদিন’, ‘তৃষ্ণা’ এবং ‘কয়েকটি মৃত্যু’।
জহির রায়হানের প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প ‘হারানো বলয়’। প্রথম গল্পগ্রন্থ’ ‘সূর্যগ্রহণ’। তিনি ‘জহির রায়হানের একশ’ গল্প নামে একটি গল্প সংকলন প্রকাশেরও পরিকল্পনা করেছিলেন। সেটি আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি। ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ নামক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার কার্যকরী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া জহির রায়হান ‘সমকাল’, ‘চিত্রালী’, ‘সচিত্র সন্ধানী’, ‘সিনেমা’, ‘যুগের দাবী’ প্রভৃতি পত্রিকার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দশ জনের খন্ড খন্ড মিছিল বের হয়। প্রথম দশজনের মধ্যে ছিলেন জহির রায়হান।
পরিচালক এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময়ে ওই ছবির নায়িকা সুমিতা দেবীর সঙ্গে ১৯৬১ সালে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের দু’ সন্তান- বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। পরে ১৯৬৮ সালে জহির রায়হান চিত্রনায়িকা সুচন্দাকে বিয়ে করেন। সুচন্দা ও জহির রায়হানের দু’ সন্তান- অপু এবং তপু।
বলা যায়, জহির রায়হান ছিলেন এদেশের প্রগতিশীল চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা। তিনি ছিলেন একাধারে কাহিনীকার, চিত্রনাট্য রচয়িতা, পরিচালক, চিত্রগ্রাহক এবং প্রযোজক। চলচ্চিত্রের আঙ্গিক ও গঠনশৈলীর নানান দিক নিয়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলচ্চিত্র শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এদেশে তিনিই প্রথম ইংরেজি ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নির্মাণ করেন। তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম রঙীন ছবি ‘সঙ্গম’ তৈরি করেন জহির রায়হান, তার হাতেই প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি ‘বাহানা’র জন্ম।
তার প্রথম পরিচালিত ছবি ‘কখনো আসেনি’। এরপর তিনি পরিচালনা করলেন ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (উর্দু : ১৯৬৪), ‘বাহানা’ (১৯৬৫)’, ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭)’ এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)। তার ‘আর কতদিন’ উপন্যাসের ইংরেজি ভাষান্তরিত ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ সমাপ্ত হবার আগেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। তিনি চলে যান ওপার বাংলায়। সেখানে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘বার্থ অব আ নেশন’। সেখানে তার তত্ত্বাবধানে বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ এবং আলমগীর কবীরের ‘লিবারেশন ফাইটারস’ নামক প্রামাণ্যচিত্র দু’টি নির্মিত হয়।
পরিচালনার পাশাপাশি অনেকগুলো ছবি প্রযোজনাও করেন। সেগুলো হলো, ‘জুলেখা (১৯৬৭)’, ‘দুই ভাই’ (১৯৬৮)’, ‘সংসার’ (১৯৬৮), ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’ (১৯৬৮), ‘কুচবরণ কন্যা’ (১৯৬৮), ‘মনের মত বউ’ (১৯৬৯), ‘শেষ পর্যন্ত’ (১৯৬৯) এবং ‘প্রতিশোধ’ (১৯৭২)।
‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি ছিল সংগ্রামী মানুষের আলেখ্য। এটি ছিল পরাধীন দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া একটি ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল। একটি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে নিষ্পেষিত জনতার জেগে উঠার প্রতিচ্ছবি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ হলো একটি দেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের পটভূমির জলজ্যান্ত চিত্র। তাইতো সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা বাংলা ছবির একটি জহির রায়হান এর ‘জীবন থেকে নেয়া’।
উচ্চতর স্বীকৃতি ও সম্মাননাও কুড়িয়েছিলেন জহির রায়হান। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস ১৯৬৪ সালে ‘আদমজী পুরস্কার’ লাভ করে। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের জন্য তাকে বাংলা একাডেমী পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়। ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ‘কাঁচের দেয়াল’ ছবিটি ‘নিগার পুরস্কার’ লাভ করে। এই ছবিটি ৭টি শাখায় পুরষ্কার জিতে নেয়। তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবি দুটিকে দেওয়া হয় বিশেষ পুরস্কার।
মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতায় বাংলাদেশের সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীদের সংগঠিত করে গঠিত ‘বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্সিয়া’ এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জহির রায়হান।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে জহির রায়হান ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন। ফিরে এসে শুনলেন অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার ১৪ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ। তিনি পাগলের মতো তাকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে দৃপ্ত কন্ঠে বললেন, ‘বুদ্ধিজীবী নিধনের পেছনে এক আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আছে এবং এই চক্রান্তের সমস্ত রহস্য তিনি অচিরেই ভেদ করবেন।’ তার উদ্যোগে বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তিনি নিজে তদন্তের কাজে নেমে পড়েন।
এমনি সময়ে কোনো একটি সূত্র থেকে সংবাদ পেলেন শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত অবস্থায় মিরপুরে আটক হয়ে আছেন। জহির রায়হান ৩০ জানুয়ারি সার্চ পার্টির সঙ্গে মিরপুরে যান। এরপর তার আর কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ভাইকে খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজেই চিরকালের জন্যে নিখোঁজ হয়ে যান।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here