সেচ কাজে সোলার পাম্প

0
1535

বদরুল ইসলাম বিপ্লব, ঠাকুরগাঁও: বোরো ক্ষেতে সেচ দিতে বিদ্যুৎ কিংবা ডিজেলের উপর নির্ভর না করে এবার সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে সেচকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সোলার পাম্প। আর সোলার পাম্পের মাধ্যমে চলতি মওসুমে অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই  প্রায় ৫০ একর জমিতে  সেচ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামের কৃষক সলেমান আলী এতদিন বৈদ্যূতিক পাম্প ব্যবহার করে নিজের বোরো ক্ষেত ও নিজস্ব মাছের হ্যাচারীতে পানি সরবরাহ করে আসছিলেন। এতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার টাকা বৈদ্যুতিক বিল পরিশোধ করতে হতো।এ অবস্থা হতে পরিত্রানের জন্য তিনি সোলার প্যানেল দিয়ে পানি সেচ দেওয়ার  পাম্প উদ্ভাবন করেন। ২০১৬ সালে তার সে প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখে।প্রথমদিকে তিনি ওই পাম্প দিয়ে ৫ একর বোরোর জমি ও মাছের হ্যাচারীতে পানি সরবরাহ দিলেও এ বছর প্রথম বারের মতো বোরো ক্ষেতে সেচ দিয়ে আসছেন। ৪টি সৌরপাম্প দিয়ে ৫০ একর জমিতে সেচ দিয়ে আসছেন।
মোলানী গ্রামের সোলেমান আলী আগে সোলার আইপিএস তৈরী করতেন।দেশে সৌর সেচযন্ত্র চালু হওয়ার পর তিনি এই প্রযুক্তি আরো সহজলভ্য করতে কাজ শুরু করেন।বাজারে থাকা সৌর সেচযন্ত্র সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। চলমান সোলার চার্জার গাড়ির মানুষ পরিবহনের বিষয়টি চিন্তায় নিয়ে একের পর এক সৌর প্যানেল,কন্ট্রোলার সহ নানা যন্ত্রপাতি লাগিয়ে  দ্রুতগতিতে পানি তুলতে পাম্পে যোগ করেন গিয়ারবক্স। আর এভাবে তিনি নিজের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে তৈরী করেন সৌর পাম্প।
এজন্য ১০টি সৌরকোষ একত্রে সংযুক্ত করে তৈরী করা হয়েছে সৌর প্যানেল। প্রতিটি সৌরকোষের ধারণ ক্ষমতা ২৫০ ওয়াট। ওই সৌর প্যানেলের উপর সূর্যের আলো পড়তেই  ভোল্টেজ তৈরী হয় এবং সংযুক্ত তারের মাধ্যমে এটি থেকে পাওয়া যায় বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ দিয়ে চলে ৩ হর্স পাওয়ারের একটি পাম্প। এই সেচযন্ত্র দিয়ে সকাল সাড়ে ৭ টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫ টা পর্যন্ত জমিতে সেচ দেওয়া যায়। সূর্যের তাপ যতই বাড়ে পানির তীব্রতা ততই বাড়ে।২৫০০ ওয়ার্ডের সৌর প্যানেল দিয়ে মিনিটে ৭শ লিটার পানি ওঠে । এমনিভাবে একদিনে ১০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যায়।
সোলেমানের হিসেবে এক ওয়াট সৌরকোষের দাম পড়ে ৫০ টাকা।সে হিসেবে ২৫০০ ওয়াটের দাম পড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।পানির পাম্প ও সোলারের অবকাঠামো তৈরীতে আরো ব্যয় ২৫ হাজার টাকা ।একটি সৌর সেচযন্ত্র তৈরীর খরচ পড়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর তার  উদ্ভাবিত প্রতিটি পাম্প বিক্রি করছেন ২ লক্ষ টাকা। এজন্য প্যানেলের ওযারেন্টি ২০ বছর এবং পাম্পের ওয়ারেন্টি ৫ বছর।এ পর্যন্ত তিনি ১৪টি সেচযন্ত্র তৈরী করেছেন। এরমধ্যে ৯ টি বিক্রি করেছেন। ২ প্রকারের সোলার পাম্প তৈরী করা হয়।একটি স্থায়ী। অন্যটি ভ্রাম্যমান বা মুভিং। সেটি বিভিন্ন জায়গায় নড়াচড়া করা যায় এবং যে কোন বোরিং এ বসিয়ে পানি তোলা যায়।
স্থানীয় চাষীরা জানান, বিদ্যুৎ চালিত নলকূপ দিয়ে জমিতে সেচ দিতে কার্ডে অগ্রিম টাকা রিচার্য করতে হয়।তাছাড়াও লোড শেডিং এর কারণে জমিতে সেচ দিতে না পারলে বোরো ধানের ক্ষেতের মাটি ফেঁটে চৌচির হয়ে যায়। ডিজেল চালিত স্যালো দিয়ে পানি সেচ দেওয়াও ঝামেলার। ডিজেল ছাড়া মেশিন চলেনা এবং পানিও ওঠেনা।একমাত্র সোলার পাম্পই ব্যতিক্রম।সোলার পাম্প থাকলে পানি তুলতে এক টাকাও লাগেনা।
সোলেমান আলী জানান, একটি বরেন্দ্র গভীর নলকূপ দিয়ে ৪০ একরের বেশি জমিতে সেচ দেওয়া যায় না।অথচ তিনি ৪টি সৌরপাম্প দিয়ে ৫০ একর জমিতে সেচ দিয়েছেন। কাজেই সরকারী সহযোগিতা পেলে তিনি সারাদেশের বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপ সুর্যের আলো দিয়ে চালিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে চান।
চলতি বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় ৫৯ হাজার ৯৭৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৪১ হাজার ২১১ মেঃ টন চাল।
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক খন্দকার মোঃ মাওদুদুল ইসলাম জানান, মলানী গ্রামের সোলেমান আলী নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার পাম্প তৈরী করেছেন। ২৫০০ ওয়াটের ৪টি প্যানেল বসিয়ে তিনি ৫০ একর জমিতে সেচ দিচ্ছেন। তার উদ্ভাবিত সোলার পাম্প ভর্তুকি মূল্যে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সেচ কাজে উৎপাদন  ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।এতে কৃষকেরা উপকৃত হতো এবং দেশে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের সাশ্রয় ঘটনো সম্ভব হবে।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here