স্বাধীনতা ও জনতার নেতা বঙ্গবন্ধু ॥ মাসুদুল হাসান

0
670

স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায় ?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
কে পরিবে পায়
বিনা স্বাধীনতায় মানুষ বাঁচতে পারে না। এখানে বাঁচা অর্থ, আত্মপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাঁচা, আত্মবিকাশের মধ্য দিয়ে বাঁচা, সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে বাঁচা, অভিমত প্রকাশ ও অবাধ বিচরণের মধ্য দিয়ে বাঁচা। এই যে এভাবে বাঁচা, তার অনুকূল পরিবেশ যদি দেশে-সমাজে বিরাজমান থাকে তাহলে বলা যায়, ব্যক্তি বা সমাজের সদস্যরা স্বাধীনতা উপভোগের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে। মানুষ স্বভাবতই স্বাধীনতা অন্বেষী, স্বাধীনতাপ্রিয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাঙালী জাতির এই সুপ্ত বাসনাকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই বাঙালীরা আজ স্বাধীন শৃঙ্খলমুক্ত জাতি। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা ঘোষণার সে সময় এদেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর ছিল, আজকের প্রজন্মের জন্য তা অনুধাবন করাও হয়তোবা কঠিন।
২৫ মার্চ, ১৯৭১। সেদিন ছিল লাগাতার চলা অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিবস। ভোর থেকেই অসংখ্য মিছিল সারা শহর প্রদক্ষিণ করতে থাকে। আজকের মিছিলের চরিত্র ছিল অন্য দিনের চেয়ে ব্যতিক্রম। মিছিলকারী সকলের হাতেই ছিল নানারকম দেশি অস্ত্র। মূলত আগের দিন অর্থৎি ২৫ মার্চ থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আজ কিছু একটা ঘটবে। সঙ্গতকারণে আন্দোলনের রূপটিও বদলে যায়।
এদিন সকাল ১১টায় সেনাবাহিনীর একটা হেলিকপ্টারে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠঠা খান, মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ এবং জেনারেল ওমর রংপুর গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে গণহত্যার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে উর্ধ্বতন সামরিক অফিসারগণ রংপুর ত্যাগ করেন। রংপুর থেকে সোজা রাজশাহী, যশোর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শন শেষে বিকেলে ঢাকা ফেরেন।

Page-1
এদিকে সর্বত্র চাউর হয়ে যায়, ইয়াহিয়ার প্রধান সাহায্যকারী উপদেষ্টা এম এম আহামদ গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে গোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া করাচীর উদ্দেশে যাত্রা করেন। এরপর ইয়াহিয়ার আরেক উপদেষ্টা এ কে ব্রোহীও ঢাকা ত্যাগ করেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি থমথমে রূপ ধারণ করে। নীলনকশা বাস্তবায়নের ভয়াল রাত ক্রমেই এগিয়ে আসতে থাকে।
দুপুর ১২টায় দলবলসহ ইয়াহিয়ার ক্যান্টনমেন্টে চলে যাওয়ার খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান, শেখ আব্দুল আজিজ, আব্দুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, গাজী গোলাম মোস্তফা, খাজা আহমদ, মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী, আব্দুস সামাদ আজাদ, মতিউর রহমান, মশিউর রহমান, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আব্দুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রত্যেককে নিজ নিজ জেলা ও এলাকায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালনার নির্দেশ দেন।
তখন নেতৃবৃন্দের প্রত্যেকেই নেতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি আমাদের বিদায় করছেন। কিন্তু আপনি কী করবেন? আপনি কোথায় যাবেন?’
বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জানি আজই তারা ক্র্যাকডাউন করবে। তবুও আমি এখানেই থাকব। কারণ, ওরা যদি আমাকে না পায়, তাহলে ঢাকা শহরকে ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করবে। আর তাছাড়া আমি নীতিগতভাবে মনে করি, আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত নেতা আমার পক্ষে পলায়ন করা সম্ভবপর নয়।
একজন বললেন, ‘ওরা তো আপনাকে হত্যা করবে।’ তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করে লাভ নাই। ওরা তো বার বার আমাকে কারাগারে নিয়েছে। আমাকে নির্যাতন করেছে। ওদের লাভ হয় নাই। আমাকে হত্যা করেও ওদের লাভ হবে না। কারণ আমার মতো লক্ষ মুজিবের জন্ম হবে বাংলাদেশে।’ এই হলেন আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু।
সূর্য ডুবলো। পাঁচটা বেজে চুয়াল্লিশ। ঠিক এক মিনিট পরেই ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে জেনারেল ইয়াহিয়া সোজা এয়ারপোর্ট চলে গেলেন। এর আগেই বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া সিরিজ বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বিমান করে করাচি পাড়ি দিলেন। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাঙালী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে পালালেন।
কৃষ্ণপক্ষের রাত। সারাদিন ধরে রোদেপোড়া নগরী চৈত্রের বিখ্যাত হাওয়ায় জুড়িয়ে আসছিল। তারপর দু’ঘণ্টাও যায়নি। ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ, ট্রাক বোঝাই দিয়ে সৈন্য ট্যাঙ্কসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা ছক অনুযায়ী পজিশন নিচ্ছে। গোলন্দাজ, সাঁজোয়া পদাতিক- তিন বাহিনী থেকে বাছাই তিন ব্যাটেলিয়ন ঘাতক।
রাত ১০টা ৩৫। নর্থ ঢাকায় সৈন্যরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ঘিরে ফেলেছে। রিসেপসনে কালো বোর্ডে চকখড়ি দিয়ে একজন বাচ্চা ক্যাপ্টেন লিখে দিল- বাইরে বেরুলেই গুলি। বিদেশি সাংবাদিকরা বেরোতে না পেরে রেডিও ধরলেন। কারফিউ-এর কোন ঘোষণা নেই। বাইরে ট্যাঙ্কের শব্দ। ছুটে সবাই ১২ তলায় উঠলেন। মেশিনগানের গুলিতে কানপাতা দায়। ভুট্টোর ঘরের দরজায় গিয়ে সবাই থমকে দাঁড়ালেন। কড়া পাহারা। কাঁচা ঘুমে জাগানো বারণ। ঢাকা-করাচি টেলিপ্রিন্টার লাইনও কেটে দেয়া হয়েছে। বাইরে পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বেতারের প্রচার।
রাত ১২টায় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী শুরু করল ইতিহাসের পৈশাচিক হত্যাকান্ড। শুরু হলো বাঙালী নিধনযজ্ঞ তথা গণহত্যা। সে জন্যই ২৫ মার্চ বাঙালীর ইতিহাসের কালরাত্রি।
২৫ মার্চ মধ্য রাতে বাংলাদেশের ভূখন্ডে রাতের অন্ধকারে পাক জল্লাদ বাহিনী এক দানবীয় নিষ্ঠুরতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালীর ওপর। চলল বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ আর ধ্বংসের উন্মত্ত তান্ডব। শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাত, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস সর্বত্রই মৃত্যু আর মৃত্যু। মানুষের কান্না ভারি হয়ে এলো শহরের আকাশ। সে কান্না ছাপিয়ে তখন আকাশে কেবলই মুহুর্মুহু আগুনের লেলিহান শিখা।
একাত্তরের অগ্নিঝরা এদিনে বাঙালী জাতি তথা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের বিভীষিকাময় ভয়াল ও নৃশংসতম বর্বরতা। একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানী দানবরা মেতে উঠেছিল নির্বিচারে স্বাধীনতাকামী বাঙালী নিধনযজ্ঞে।
২৫ মার্চ জিরো আওয়ারে গণহত্যা শুরুর অর্ধ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেন, “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন!”
১৯৭১-এর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ১২-৩০ মিনিটে স্বাধীনতার এই অমোঘ মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ থেকে।
২৬ মার্চের সূচনালগ্নে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা করে বলেন-
‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ- দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আমাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।’
বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বর ও নির্বিচারে গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সর্বব্যাপী পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতি তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ইস্পাতকঠিন প্রত্যয় নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালী।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী রাত ১২টায় পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকার চারটি স্থানকে টার্গেট করেÑঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, তৎকালীন ইপিআর সদর দফতর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং ধানমন্ডি ৩২নং বঙ্গবন্ধুর বাসভবন।
ভয়াল কালরাতের ধ্বংসস্তূপ আর লাশের ভেতরে দিয়ে রক্ত রাঙ্গা সেই নতুন সূর্য। ভীতবিহ্বল মানুষ দেখল লাশপোড়া ভোর। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুন্ডুলী পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। পুড়ছে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল-সবুজ পতাকা। জ্বলছে শাড়ি, খুকুর ফ্রক। চোখে জল। বুকে আগুন। জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ তীব্র স্লোগান তুলে ট্যাঙ্কের সামনে এগিয়ে দিল সাহসী বুক।
সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা তুমুল যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা।
স্বাধীনতা আমার গর্ব, স্বাধীনতা আমার অহংকার। স্বাধীনতা সে আমার স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন, স্বাধীনতা আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পূর্ণ হলো। স্বাধীনতার পর সুদীর্ঘ সময়ে নানা বাধা ও চক্রান্তে আমরা পিছিয়েই পড়েছি শুধু। আমাদের সে বন্ধ্যাসময় কেটে গেছে। দেশ এখন সমৃদ্ধির সোপানে এগিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দারিদ্র আর পশ্চাদপদতার বদনাম ঘুচিয়ে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে নিয়ে এসেছেন। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মূলমন্ত্র হারিয়ে যায়নি, আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দর আগামী। আজ আমরা নিঃসঙ্কোচে নতুন করে আবার বলতে পারি-
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে, ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই…।’
মাসুদুল হাসান : কলাম লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here