জনতা থেকে বৈচিত্র

0
149

রোকেয়া ইসলাম
৯৭ কি ৯৮ সালের কোন এক পড়ন্ত বিকেলে ফোন করি দৈনিক জনতার কার্যালয়ে সাহিত্য সম্পাদককে। কয়েকদিন আগে একটা গল্প পাঠিয়েছিলাম সেটা কি অবস্থায় আছে জানতে।
কলটা হাত বদল হয়ে সাহিত্য সম্পাদকের কাছেই যায়। জানতে পারি আগামীকালের সাহিত্য সাময়িকীতেই প্রকাশ হচ্ছে গল্পটা। ধন্যবাদ দিতে গিয়ে আমার ঝুলিতেই ফিরিয়ে দিলেন সুদ-আসল যোগ করে। এরপর থেকে নিয়মিতই যোগাযোগ হতে থাকে। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থেকে অনেক বেশি কথা হয়েছে সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাহিত্য সম্পাদক শাহীন রেজার সাথে। দৈনিক জনতার সম্পাদক তখন মতিন ভাই। খুব ভালো মানুষ এবং সাহিত্যামোদী। আর মাশুক চৌধুরী বার্তা সম্পাদক। তিনি একজন বিখ্যাত কবি। হয়ত সে কারণেই সাহিত্য পাতার প্রতি তাদেরও বিশেষ ঝোক।
কবি শাহীন রেজার সাথে কথা হচ্ছে, বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা পড়ছি। কিন্তু দেখাতো হচ্ছে না। সে সুযোগও মিলে গেল একদিন কোন এক কবির জš§দিনের অনুষ্ঠানেÑ এলেন আমার পড়া ও শোনা কবি শাহীন রেজা। শাহীন রেজার কণ্ঠ শুনে একটা ছবি এঁকেছিলাম মনে মনে। বাস্তবে সেই ছবিটার ছিটেফোটাও মিল নেই। ভেবেছিলাম কবি যখন, তখন পাঞ্জাবি আর ঝোলাতো থাকবেই কিন্তু না তার পরনে জিনস্ কেডস্-টি শার্ট। ছোটখাট একজন মানুষ। শরীর আর মুখাবয়বে বয়স আটকে রেখেছে পয়ত্রিশের কোঠায়।
ডাইনামিক কিন্ডার গার্টেনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষা আমি। আমারই উদ্যোগে প্রতি মাসে সেখানে খুব ছোট পরিসরে বসতো সাহিত্যের আড্ডা। আর প্রতিটা আড্ডার মধ্যমণি সদালাপী প্রাণবন্ত আড্ডা জমিয়ে রাখার দক্ষ কারিগর কবি শাহীন রেজা। সেই আড্ডা কখনও তুরাগের জল ছোয়া খোলা সবুজ প্রান্তরে, কখনও বোটানিক্যাল গার্ডেনের পুষ্পবনে। ভক্তকূল একটা মাস প্রতীক্ষায় থাকতো কবে আসবেন শাহীন রেজা।
কবি শাহীন রেজার কবিতা আমার খুব ভাললাগে। সহজ সুন্দর ছোট, ঠোঁট ছুয়ে বের হওয়া সুখপাঠ্য শব্দগুলো অনায়াসেই পাঠকের হৃদয়ের মর্মে পৌঁছতে পারে। কবিতাগুলো পড়ার সময় মনে হয় সামনে অবারিত সবুজ ধানের ক্ষেতে মাতাল বাতাস বইছে বা গহীন বনে প্রাচীন বৃক্ষে বসে ডাকছে বসন্তের কোকিল অথবা শান্ত নদীটি বইছে তার নিজেরই মতন।
শুধু প্রবাহমান জীবনই তার কবিতায় ধরা দেয় না। অনিবার্য মৃত্যুও মহিমা ছড়ায়। ভাষা তার আয়ত্বে। নিবেদিত এই কবি অবশ্যই নিরহংকারী। দীর্ঘদিনের পরিচয়ে বলতে পারি তার চিন্তা ভাবনা অবশ্যই পজেটিভ।
কবি শাহীন রেজার কবিতাকে যেমন আলাদা করা যায় অনায়াসেই তেমনি তার সাবলীল সুললিত কণ্ঠের মাদকতাও আলাদা। আমার লেখা কবিতা যখন শাহীন রেজা তার স্টাইলে পড়েন তখন কবিতার আবেদনটাই হয়ে যায় আলাদা, অন্যরকম।
কবি শাহীন রেজা আপাদমস্তক একজন কবি, তাই কিছুটা রহস্যপ্রিয়তা তার আছে। তিনি অনেকগুলো কোম্পানির সীম ব্যবহার করেন। কোনটা যে কখন চালু রাখেন সেটার হিসাব ধরা খুব মুশকিল। জানি ফোন দিয়ে কোন লাভ নাই, তাই ফোন না দেয়ারই চেষ্টা করি। তারপরও তো ফোন দেবার প্রয়োজন হয়।
অনেক অ-নে-ক কষ্ট করে তাকে ফোনে পেতে হয়। আমার কষ্টটা শাহীন রেজা কমিয়ে দেন। কিভাবে যেন মাঝে মাঝে আমার প্রয়োজনটা তার ভেতরে নক করে। তিনি নিজেই ফোন দেন। আর বিশেষ দিনগুলোতে তো বটেই। চমৎকার একটা এসএমএস আসবেই।
২০১০ এর কোন এক শেষ দুপুরে শাহীন রেজার ফোনÑ তিনি আমার বাসার খুব কাছেই এসেছেন। আমিও নাছোড় বান্দা বাসায় আসার জোরাল আহ্বান। দুপুরের মরা-রোদ কালো গাড়িতে মেখে আসে। সঙ্গে শরতের আকাশ আর সাদা কাশফুলের প্রচ্ছদের ঢাউস সাইজের ‘বৈচিত্র’ নামের ঈদসংখ্যা। প্রচ্ছদটার উপর মোলায়েম হাত বুলাতে ইচ্ছা করে। ভেতরের লেখাগুলোর বেশিরভাগই মানসম্পন্ন। পত্রিকাটার সম্পাদক যে শাহীন রেজা এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবিতার মতই তার সম্পাদিত পত্রিকাকে সহজেই আলাদা করা যায়।
কি সাহিত্য সম্পাদক কি সম্পাদক হিসেবে তার সবচেয়ে বড় গুণ হল কখনও দলবাজি দশকবাজিকে স্থান দেন না। ভাল লেখাটাকেই তাকে প্রাধান্য দিতে দেখেছি।
শাহীন রেজার জš§দিনে অনেক অনেক বৈচিত্রময় শুভেচ্ছা শুভকামনা। তুই ভাল থাক কবি, তোর যতদিন ইচ্ছে বেঁচে থাক ততদিন। কারণ তোর জিজ্ঞাসার উত্তর তো খুঁজতে হবে, রাত জেগে সাধনায়, মজ্জায়, আত্মায়Ñ
“একটি প্রত্যাশার মধ্যে লুকিয়ে আছে সকল জš§ সকল মৃত্যু সকল সৃষ্টি এবং সকল বিলয়
হে ঈশ্বর, হে বিশ্বাস, আমরা কোন পথে যাব?”

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here