ঢালিউডের বর্তমান অবস্থা : জাজ ও চলচ্চিত্র পরিবার

0
203

বিনোদন প্রতিবেদক : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ ও গৌরবের। দেশ বিভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ দোসানির পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্যে ক্ষুদ্ধ হয?ে জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এরপর বাংলাদেশের গুণী নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণে আরো আগ্রহী হয়ে সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেন।  একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা তৈরি হতে থাকে। ঢাকাই সিনেমার সাফল্য দেশের গ-ি পেরিয়ে দেশের বাইরেও সুনাম অর্জন করে। ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের হলগুলোতে ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। দেখানো হতো হিন্দি ও উর্দু ভাষার সিনেমাও। কিন্তু সেসব সিনেমা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকাশে। নব্বই দশকের শেষের দিকে অধিক লাভের আশায় এক দল অসাধু লোভী প্রযোজক নির্মাণ করেন অশ্লীল সিনেমা। এ ঝড় ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্ত অবস্থান ভেঙে তছনছ করে দেয়। দর্শক পরিবার-পরিজন নিয়ে হলে যেতে বিব্রত হতে শুরু করেন। আস্তে আস্তে হলবিমুখ হয়ে পড়েন দর্শক।
বিশ্বে যখন ডিজিটাল সিনেমা নির্মিত হচ্ছিল তখনো বাংলাদেশে থার্টি ফাইভে সিনেমা নির্মাণ করা হতো। নেট দুনিয়ার মাধ্যমে অবাধ আকাশ পথ খোলা থাকায় দর্শক খুব সহজেই বিশ্বের বিভিন্ন সিনেমা অনায়াসে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। তাছাড়া ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো উম্মুক্ত থাকায় ভারতীয় ডিজিটাল সিনেমা দেশের দর্শক অহরহ দেখছেন। এসব কারণে ঢাকাই চলচ্চিত্রের থার্টি ফাইভে সিনেমা দেখতে একদমই অভ্যস্ত নয় এ দেশের দর্শক। দর্শক শূন্য প্রেক্ষাগৃহ থাকায় একের পর এক হল বন্ধ হতে শুরু করেছে। ১৪শ প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে এখন প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে মাত্র ৩৫০টি। এর মধ্যে সারা বছর চলে ২৫০টি আর ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে চলে বাকি হলগুলো।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের এমন বেহাল দশায় ২০১২ সালে ধূমকেতুর মতো আগমন ঘটে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার। এ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করে। সে বছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ভালোবাসার রং’ নামে ডিজিটাল সিনেমা নির্মিত হয়। নির্মাণের পর সিনেমাটি মুক্তি দিতে বিলম্ব হয়। কারণ তখন বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো ডিজিটাল হয়নি। এরপর জিজিটাল প্রজেকশন বসিয়ে দেশের কিছু হল ডিজিটাল করে সিনেমা মুক্তি দেয়া হয়। সে সময় উদ্যোগ নিয়ে কিছু প্রেক্ষাগৃহে ডিজিটাল প্রজেকশন বসায় এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। বতর্মানে তারা ২৮৩টি প্রেক্ষাগৃহে প্রজেকশন বসিয়েছে এবং ১৬টি প্রেক্ষাগৃহ ক্রয় করেছে।
এরপর ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সিনেমা মুক্তি পেয়েছে মোট ২৯৫টি। এর মধ্যে জিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত ২৪৯টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। চলতি বছর ৪০টির মতো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। মোট কথা ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫০টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে জাজ মাল্টিমিডিয়া থেকে মুক্তি পেয়েছে ৩০টি সিনেমা। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ‘পাষাণ’, ‘পোড়ামন-টু’ ‘বেপরোয়া’সহ কয়েকটি সিনেমা নির্মাণাধীন রয়েছে। গত পাঁচ বছর দেশের অন্যান্য অধিকাংশ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে একটি করে সিনেমা তৈরি হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একাধিক সিনেমা নির্মাণ করেছে।
সেখানে জাজ মাল্টিমিডিয়া প্র্রযোজনা করেছে ত্রিশটি সিনেমা। চলচ্চিত্রের মন্দা বাজারে এটি গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ বছরের আলোচিত সিনেমার তালিকা দেখলে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ৩৫০টি সিনেমার মধ্যে মাত্র ৪০টি সিনেমা আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ১৫টি সিনেমা। বাকি ২৫টি সিনেমা অন্যান্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের।
জাজ মাল্টিমিডিয়া শুরুতে একক প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণ করলেও পরে ভারতের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা নির্মাণ শুরু করে। যৌথ প্রযোজনার সিনেমাগুলো ছিল সুপার হিট। দুই বাংলায় প্রশংসিতও হয়। অর্থাৎ শুধু আধুনিক প্রজেকশন বসিয়ে নয়, সিনেমা নির্মাণ করেও দর্শক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ‘হিরো ৪২০’, ‘প্রেম কি বুঝিনি’, ‘নবাব’ নামে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা ভারতীয় শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে নির্মাণ করা হয়। এসব চলচ্চিত্রে নামমাত্র কয়েকজন বাংলাদেশের শিল্পী ছিল। এতে সমালোচনার জন্ম দেয়। এরপর যৌথ প্রযোজনার সঠিক নিয়মনীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে চলচ্চিত্র পাড়ায়।
গত ঈদুল ফিতরে ‘বাদশা’ ও ‘নবাব’ নামে দুটি যৌথ প্রযোজনার সিনেমা মুক্তি না দেয়ার জন্য আন্দোলনে নামে চলচ্চিত্রের ১৮টি সংগঠনের সমন্বয়ে চলচ্চিত্র পরিবার। এ নিয়ে রাজপথে মিছিল, সেন্সর বোর্ডের সামনে অবস্থান ধর্মঘট, এমনকি সেন্সর বোর্ডের সদস্য ও হল মালিক সমিতির সভাতি নওশাদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটে। এরপর চলচ্চিত্রাঙ্গন দুইভাবে বিভক্ত হয়।
চিত্রনায়ক শাকিব খানের অশোভন মন্তব্যে তাকে বয়কট করে চলচ্চিত্র পরিবার। এছাড়া জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজসহ কয়েকজনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে চলচ্চিত্র পরিবার। যদিও পরবর্তীতে শাকিব খানের উপর থেকে বয়কট তুলে নেয়া হয়। এর আগে বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। শাকিব খানের উপর হামলা, মামলা, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নও তোলেন ওমর সানিসহ অন্যান্যরা। এসব কারণে চলচ্চিত্র পরিবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
নাসির উদ্দিন দিলু, কাজী হায়াৎ, আব্দুল আজিজ, ওমর সানি, মৌসুমী, শাকিব খানসহ প্রায় দুইশত সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় ‘চলচ্চিত্র ফোরাম’ নামের নতুন সংগঠন। চলচ্চিত্রের দুই ভাগে বিভক্তের কারণে প্রযোজক চলচ্চিত্রের অর্থ লগ্নি করতে ভয় পাচ্ছেন। যার ফলে সিনেমা নির্মাণ কিছুটা হলেও কমে যাচ্ছে। মাঝে চলচ্চিত্রে সুদিনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। এখন এ সম্ভাবনা অনেকটাই মলিন। এর একমাত্র কারণ দুই ভাগে বিভক্ত হওয়া। চলচ্চিত্রের সকল সংগঠন তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের স্বার্থে। শিল্পী ও কলা কুশলীদের স্বার্থ রক্ষায়। সম্প্রতি গঠিত চলচ্চিত্র ফোরাম চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন ও শিল্পী, কলাকুশলীদের স্বার্থ রক্ষায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই পড়ন্ত বিকালে শুধু প্রযোজক নয়, দরকার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। যেগুলো থেকে বছরে কমপক্ষে ছয়টি সিনেমা প্রযোজনা করা হবে। এমন পাঁচটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থাকলেই চলচ্চিত্রের বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে। ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা না করে সিনেমা নির্মাণের প্রতিযোগিতা করলেই এদেশের শিল্পী ও কলাকুশলীরা কাজের সুযোগ পাবেন। ফিরে আসবে চলচ্চিত্রের সুদিন। কিন্তু কেন আসছে না নতুন আরো অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান?
প্রযোজক না আসার কারণ হিসেবে চলচ্চিত্র পাড়ায় ভাসছে সিনেমার বাজার মন্দার কথা। এ কারণে নতুন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অর্থ লগ্নি করতে আগ্রহী নয়। এছাড়া আরও একটি কথা বলছেন অনেকে- দেশের ২৮৩টি হলে জাজ মাল্টিমিডিয়ার মেশিন বসানো। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রজেকশন বসানোর ফলে সুবিধাটাও কম পাচ্ছে না এই প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ দিবসে তাদের সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়া হয়। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা যাচাই না করেই বলা যায়, ব্যবসার খাতিরে প্রযোজক অবশ্যই ভালো তারিখে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেবেন এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু প্রজেকশন তাদের সুতরাং তারা কিছুটা বৈষয়িক চিন্তা বিবেচনায় সুবিধা নিতেই পারেন।
কিন্তু এ সমস্যার সমাধান কী?
এ সমস্যার সমাধান সরকারি অর্থায়নে দেশের সকল প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ডিজিটাল প্রজেকশন বসানো। এতে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হতে হবে না কোনো প্রযোজককে। অথচ এই দাবিতে কেউ সোচ্চার হচ্ছেন না। দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু সেখানে পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়িই যেন মুখ্য। আসল কথা কেউ বলছেন না। উল্টো অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ডিজিটাল প্রজেকশন বসানোর দাবিটি অন্য দাবির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অধিকন্তু বাড়ছে ভেদাভেদ।
চলচ্চিত্রের এই বিভক্তিতে এগিয়ে আসা উচিৎ চলচ্চিত্রের অভিভাবকদের। চলচ্চিত্রের স্বার্থে কোনো বিভক্তি চলচ্চিত্রেরই ক্ষতি করবে। ভেদ ভুলে এখন প্রয়োজন বেশি বেশি সিনেমা নির্মাণ করা। তা না হলে এ শিল্পের ধ্বংস অনিবার্য।

Share on Facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here